Friday, March 4, 2022

সাহিত্য, বাজার, অস্বস্তি - ডাকবাংলা.com ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২

 


 

সাহিত্য, বাজার, অস্বস্তি


মৈত্রীশ ঘটক

 


ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২ 


সাহিত্য ও বাজার শুনলে প্রথমেই মনে হয় যেন তেল আর জল। অর্থাৎ, আপাতদৃষ্টিতে এদের মেশানো মুশকিল। কিন্তু আবার রান্নার উপকরণের রূপক দিয়েই যদি বলতে হয়, তাহলে এমন রান্নার কথা ভাবা মুশকিল, যেখানে কোনো না কোনো সময় তেল ও জল দুই-ই লাগে না। কবির ভাষায় তাই বলাই যায়, ‘মেলাবেন তিনি, মেলাবেন।’ কিন্তু প্রশ্ন হল, ‘তিনি’ কে, তিনি কীভাবে মেলাবেন, এবং যা তৈরি হবে সেটা সুস্বাদু ও সুপাচ্য হবে তো?  

তারও আগে প্রশ্ন জাগতে পারে, সাহিত্য হল উচ্চমার্গের ব্যাপার, তার সাথে বাজার— যে কথাটার মধ্যেই একটা আঁশটে গন্ধ আছে— তার মধ্যে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা কেন? শিল্প তো ভাবজগতের ব্যাপার, আর বাজার বস্তুজগতের। এদের মধ্যে সম্পর্ক কী? 

কিন্তু ভাবুন, বিমূর্ত শিল্পও তো বিক্রি হয়। তার শৈল্পিক মূল্য একটা ব্যাপার, আর মানুষের হাতে বিনিময় হবার সময় একটা আর্থিক অঙ্ক যুক্ত হয়ে যায়— সেটা আরেকটা ব্যাপার। আসলে মূল্য (value) আর দাম (price)— বা মার্ক্সের ভাষায় ব্যবহার-মূল্য আর বিনিময়-মূল্য— অনেক সময়ে একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও, ব্যাপার দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। মূল্য মানুষের মনে, যে মনের গহন রহস্য অনেক সময় বোঝা মুশকিল। আর দাম হল চাহিদা আর জোগানের ঠোকাঠুকিতে ঠিক হওয়া একটা অঙ্কমাত্র, যাতে কোনো জিনিসের বিনিময় হয়। আপনার প্রিয় কোনো ব্যক্তিগত জিনিস আপনার কাছে অমূল্য (প্রিয়জনের দেওয়া উপহার), কিন্তু তার বাজার-দাম বেশি না-ও হতে পারে।  আবার বাজার-দাম খুব বেশি মানেই সেই জিনিস আপনার রুচি অনুযায়ী খুব মূল্যবান না-ও হতে পারে, বা পয়সা দিলেও আপনি নেবেন না এরকম অনেক উদাহরণই ভাবা যেতে পারে। 

আসলে  বাজার কথাটা অনেক অর্থে ব্যবহার হয় এবং আমাদের ‘সাহিত্য’ ও ‘বাজার’ একসাথে শুনলে যে অস্বস্তি হয় তার পেছনে সেটা একটা বড় কারণ। প্রথমত, বাজার একটা বণ্টনব্যবস্থা। ঠিক যেমন জলের কল দিয়ে যাতে জল আসে তার জন্যে একটা জলবণ্টন ও জলনিকাশ ব্যবস্থার পরিকাঠামো থাকে, সেরকম পাঠকের হাতে পছন্দমতো বই আসার জন্যেও একটা বণ্টনব্যবস্থা প্রয়োজন। বাজার না থাকলে আপাতদৃষ্টিতে বাজারি মানসিকতা-মুক্ত বইগুলোই— যেমন কবিতার বা প্রবন্ধের বই— বা আমাদের হাতে  আসবে কোথা থেকে? রেশনের দোকান বা সরকারি দপ্তর থেকে তো নয় (সরকারি দপ্তর থেকে যে বই বেরোয় না তা নয়, কিন্তু তা হাতে পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না)। একই বাজারে নীহার গুপ্তের জমজমাট ডিটেকটিভ বই পাওয়া যায় আবার মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’— যার যেমন রুচি সেই অনুযায়ী লেখক ও পাঠককে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কাজটাও বাজারই করে। এমনকী বাজার-বিরোধী, বা বৃহত্তর অর্থে ধনতন্ত্র-বিরোধী বইও আমাদের হাতে আসে বইয়ের বাজার থেকেই— বাজার ছাড়া মার্ক্স বা সার্ত্র থেকে চমস্কি বা অধুনা ভারুফাকিস আবার ওই দিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমর সেন থেকে নবারুণ ভট্টাচার্য, কার বই আমরা হাতে পেতাম?  

পাঠকের হাতে বই আসে বইয়ের দোকান থেকে এবং বইয়ের দোকানে বই যায় প্রকাশকের কাছ থেকে, ছাপাখানা থেকে বই এসে জমা পড়ে প্রকাশকের দপ্তরে, লেখকের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি যায় প্রকাশকের কাছে— অর্থাৎ, পাঠক আর লেখকের মধ্যে যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় তার মধ্যে কিন্তু একাধিক পর্যায়ে বাজারের মধ্যস্থতা আছে। এখন ই-দুনিয়ায় গোটা ব্যাপারটা আন্তর্জালের ইন্দ্রজালে হয় খানিক— কিন্তু প্রযুক্তি আলাদা হলেও মূল যুক্তিটি একই রকম। আসলে সাহিত্য কেন, সংস্কৃতির অন্যান্য ধারাতেও বাজার, বা বৃহত্তর অর্থে বাণিজ্যিক দিককে অগ্রাহ্য করা মুশকিল। জনপ্রিয় ছবি হোক বা আর্ট ফিল্ম, ছবি তৈরির প্রক্রিয়া থেকে দর্শকের কাছে পৌঁছনো অবধি অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়, যেখানে অর্থের লেনদেন আবশ্যক এবং বইয়ের জগতের তুলনায় প্রযুক্তিগত ফারাকের জন্যে অনেক মানুষ তাতে জড়িত থাকেন এবং আর্থিক বিনিয়োগের দিকটা সাহিত্যের জগতের থেকে অনেক বেশিমাত্রায় প্রয়োজন হয়। 

তাহলে সমস্যা কোথায়? ‘সাহিত্য’ ও ‘বাজার’ একসাথে শুনলে কেন অস্বস্তি  হয়? প্রথম সমস্যা হল, বাজারে সাফল্য আর উৎকর্ষের মধ্যে কোনো আবশ্যক সম্পর্ক নেই। বিনোদনমূলক সাহিত্য বাজারে বেশি বিক্রি হয়— যেমন, ড্যান ব্রাউনের বই যত বিক্রি হয়, হারুকি মুরাকামির বইয়ের বাজার তার তুলনায় খুবই সীমিত। বরং শিল্প বা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যা জনপ্রিয়, তা অনেকসময়েই নিম্নমানের বলে মনে করা হয়। আর সমঝদার পাঠক যার কদর করেন, তার বাজারদর বা জনপ্রিয়তা অনেকসময়ই খুব বেশি হয় না। আবার সাহিত্যগুণের দিক থেকে যা উচ্চমানের, তা অনেক সময়েই ক্ষুদ্র প্রকাশক বা লিটল ম্যাগাজিনের সূত্রেই আমাদের হাতে আসে। আসলে যেখানে ব্যবসা বেশি হবে, বাজারের স্বাভাবিক প্রবণতা সেদিকে ধাবিত হওয়া, কারণ বাজারের একটা বড়ো চালিকাশক্তি হল মুনাফার উদ্দেশ্য। সেই জন্যেই ‘বাজার’ বা ‘বাজারি’ শব্দগুলো নিয়ে আমাদের অস্বস্তি— যেহেতু আমজনতার রুচি আর বিদগ্ধ ও রুচিশীল পাঠকের রুচি খুব অল্প ক্ষেত্রেই মেলে, তাই কোনো বই ‘বাজার-সফল’ বা ‘বেস্টসেলার’ শুনলে অনেকেরই সন্দেহ জাগে, পড়ার যোগ্য তো?

এইভাবে ভাবলে সাহিত্য ও বাজারের মধ্যে যে আপাত-দ্বন্দ্ব, তার খানিক নিষ্পত্তি হয়। এটা ঠিকই যে, খুব অভিনব বা উচ্চমানের সাহিত্যকীর্তির পাঠকসংখ্যা অন্তত প্রথমদিকে বেশি হয় না, আর তাই অনেকসময়ই তা বাজারের নিক্তিতে দ্রুত সাফল্য পায় না। আবার বিনোদনমূলক সাহিত্যের বাজার মোটামুটি সবসময়েই একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলে। এইভাবে দেখলে বাজার-সাফল্য ও সাহিত্যিক গুণমানের মধ্যে অবশ্যই দ্বন্দ্ব আছে।

কিন্তু বাজার মাছেরও হয়, আবার বিমূর্ত শিল্প বা গবেষণার বইয়েরও হয়। বাজার মানেই সব তরল করে দেওয়া সহজ করে দেওয়া, এটা একটু অতিসরলীকরণ। হয়তো বাজার বলতে আমরা গণ-বাজার (mass market) ভাবি, যেখানে সহজপাচ্য ও বিনোদনমূলক লেখা বেশি কাটবে। কিন্তু বাজারের মধ্যে তো বিশেষ পাঠকের উদ্দেশ্যে লেখা বইয়ের বাজারও (যাকে ‘niche market’ বলা হয়) পড়ে, যাকে ‘পছন্দসই বাজার’ বলা যেতে পারে।  এখানে বাজারের মূল ভূমিকা হল, পাঠক ও তার রুচি অনুযায়ী বইয়ের ‘যোগ’ (অর্থাৎ, match) করে দেওয়া ।   

সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই পছন্দসই বাজার ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুটো জিনিসের উপযোগিতা যদি একদম এক  হয়— যেমন চাল, যা দিয়ে ভাতই তৈরি হবে— তখন মূল প্রশ্ন হল, কোনটা ‘ভাল’ আর কোনটা ‘খারাপ’ এবং সেই নিয়ে অধিকাংশ লোকই একমত হবেন। কিন্তু যে জিনিসের উপযোগিতা বিভিন্ন লোকের কাছে আলাদা— কেউ চা বেশি পছন্দ করেন এবং কেউ কফি এবং এদের মধ্যেও গন্ধ ও স্বাদের হাজার রকমের পার্থক্য আছে— সেখানে এরকম ভাল-মন্দের তালিকা করার অর্থ হয় না। এইখানে বাজারের মূল ভূমিকা হল: যার যেরকম রুচি তাকে তার পছন্দের জিনিসের সন্ধান দেওয়া। পছন্দের জিনিসের মধ্যে নিশ্চয়ই গুণমানের তফাৎ আছে— ডিটেকটিভ গপ্পে আমার প্রিয় ব্যোমকেশ-ফেলুদা, আর বিকল্পধারার কবিতায় তুষার রায় বা অনন্য রায়— কিন্তু এই দুটো শ্রেণির সাহিত্যকে মেশানো উচিত নয় ।    

এইভাবে ভাবলে সাহিত্য ও বাজারের মধ্যে যে আপাত-দ্বন্দ্ব, তার খানিক নিষ্পত্তি হয়। এটা ঠিকই যে, খুব অভিনব বা উচ্চমানের সাহিত্যকীর্তির পাঠকসংখ্যা অন্তত প্রথমদিকে বেশি হয় না, আর তাই অনেকসময়ই তা বাজারের নিক্তিতে দ্রুত সাফল্য পায় না। আবার বিনোদনমূলক সাহিত্যের বাজার মোটামুটি সবসময়েই একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলে। এইভাবে দেখলে বাজার-সাফল্য ও সাহিত্যিক গুণমানের মধ্যে অবশ্যই দ্বন্দ্ব আছে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে সচেতন থাকলে— জনপ্রিয় মানেই তা নিম্নমানের, আবার বাজারে কাটেনি মানেই তা কালজয়ী সাহিত্য: এরকম সরল সমীকরণ করার কোন অর্থ হয় না।   

আরেকটা বড় সমস্যা হল, বাজারের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একচেটিয়া ক্ষমতা এবং ‘পুঁজি যার মুলুক তার’ গোছের প্রবণতা জড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ সাহিত্যের বিভিন্ন শ্রেণি বা বিভাগের মধ্যে তফাৎ করার সমস্যাটা (যেটা নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করলাম) যদি সরিয়েও রাখি, যা বাজারে আসে তা সেই শ্রেণির সাহিত্যের মধ্যেও সর্বশ্রেষ্ঠ— তা ভাবার কোনো কারণ নেই। বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনজরে এলে সেই লেখকের যে প্রচার হবে, তা সমান বা অধিকতর প্রতিভাবান কোনো লেখক যিনি এই সুযোগ পাননি বা চাননি, তাঁর  হবে না। 

বাজারে সাফল্য ও উৎকর্ষের মধ্যে তাই কোনো সোজা সম্পর্ক নেই, আর এই সমস্যার কোনো সোজা সমাধানও নেই। 

তবে এখানে আধুনিক প্রযুক্তির একটা সদর্থক ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়। নতুন উদ্ভাবনার কাজই হল সাবেকি ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়া। ডিজিটাল বিপ্লব (যেমন, ডিটিপি, অনলাইন বিপণন, ই-রিডার) বাংলা সাহিত্যের বাজারকে নাড়িয়ে দিতে পারে কি? 

 

এটা ঘটনা যে, গত কয়েক দশকে প্রকাশনার পৃথিবীতে প্রযুক্তিগতভাবে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন তুলনায় ক্ষুদ্র বা অনামী প্রকাশনার থেকেও যে গুণমানের বই বেরোয়, তা আগে ভাবা যেত না। আমার ছোটবেলার স্মৃতি হল, একটু অনামী প্রকাশনার বই কেনার কিছুদিন বাদে ‘লুচিভাজা’ হয়ে যেত। এখন প্রচ্ছদ, বাঁধাই, ছাপার গুণমান সবদিক থেকে বড় এবং ছোট প্রকাশনার বইয়ের মধ্যে তফাৎ করা শক্ত হয়ে গেছে এবং বই প্রকাশনার গুণমানের আগের থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে। 

আরেকটা কথা হল, ডিজিটাল এবং ছাপার মাধ্যম— এগুলো কি পরস্পরের বিকল্প না সম্পূরক? আমি ব্লগ পড়ি বা ই-রিডারে বই পড়ি বলে কি আমি আর পত্রিকা বা ছাপা বই কিনে পড়ি না? আমার ক্ষেত্রে আমি যত পড়ি (বা গান শুনি, বা সিনেমা দেখি) তত পড়ার ইচ্ছে বাড়ে, তাই আমার কাছে এগুলো সম্পূরক। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল দুনিয়ায় বইয়ের অনেক খবর পাওয়া যায়— যাঁদের মতকে গুরুত্ব দিই তাঁরা কোনো বইয়ের উল্লেখ করলে ভাবি, এটা পড়তে হবে। আর অনলাইন অর্ডার দিলাম দু-একদিনে বাড়িতে এসে গেল বই, সেই সুবিধের দিকটা তো আছেই। আগে কলকাতায় না থাকলে, কফি হাউসের আড্ডাতে অংশগ্রহণ না করলে, বা পাতিরামে না গেলে, বিকল্প জগতে কী লেখা হচ্ছে— সে লিটল ম্যাগাজিন হোক বা মূলধারার বাইরে প্রকাশনাগুলোর ছাপা বই— তাদের সম্পর্কে জানতে পারতাম না। এইসব ভাবেও ছাপা বইয়ের ব্যবসার পক্ষে ডিজিটাল বিপ্লব সদর্থক ভূমিকা পালন করেছে। 

কিন্তু তার সাথে চোরাই ডিজিটাল-কপি অনায়াসে হাতে এসে যাচ্ছে, সেটা বইয়ের ব্যবসার পক্ষে ভাল হতে পারে না। আর, যে-জিনিসটা ‘ফ্রি-তে’ পাওয়া যাচ্ছে যা তার জন্যে পয়সা দেব কেন— সেই মনোভাবও আছে। এটা একটা বিষচক্রের মত। লেখালেখি যেহেতু শখ, উপার্জনের একমাত্র পথ  নয়, তাই বইয়ের ‘ফ্রি’ ডিজিটাল কপি আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে পাঠকেরা ততটা নৈতিক অস্বস্তি বোধ করেন না, যতটা দোকানে পয়সা না দিয়ে জিনিস তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে (আশা করা যায়) কাজ করত। আবার এই কারণেই লেখালেখিকে পেশা করার কথা লোকে সহজে ভাবেন না, কারণ উপার্জনের সম্ভাবনা অন্য বাঁধাধরা চাকরির তুলনায় সীমিত।    

 

তবে বাজার, সাহিত্য বা সাফল্য— কোনো ক্ষেত্রেই ঘুরেফিরে বাঙালি মানসকিতার বিশেষ ভূমিকা না দেখলে চলবে না। সাফল্য আর উৎকর্ষের মধ্যে কোনো আবশ্যক সম্পর্ক নেই, কিন্তু তাহলেও বাংলায় মূলধারাকে একটু অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। বিদেশেও কোনটা বেশি মধ্যরুচির আর কোনটা উচ্চরুচির (যেমন, New York Times বনাম New York Review of Books), কোনটা মূলস্রোতের আর কোনটা বিকল্পধারার, কোনটা বামপন্থী কোনটা মধ্যপন্থী— এই নিয়ে পরিষ্কার শিবির-বিভাজন আছে। কিন্তু ‘আমি রব নিষ্ফলের হতাশের দলে’ এই নিয়ে গর্ব করার মানসিকতা চোখে পড়েনি। এমন কী র‌্যাডিকাল প্রকাশনাও চায়, তাদের বই বিক্রি হোক।  

শিল্পীর বস্তুগত সাফল্যের প্রতি, অর্থাৎ বাজার-সফলের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা, বা অন্তত সেই অনীহার প্রতি শ্রদ্ধা— এটা বাঙালির দোষ এবং গুণ দুটোই। দোষ: কারণ উৎকর্ষ ফাঁকি দিয়ে হয় না। এবং ব্যর্থতা মানে ‘আমার প্রতিভা কেউ বুঝল না’ হওয়ার থেকে ‘আমি অত ভালো নই’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেটা সবাই জানে, তাই সাফল্যের প্রতি অনীহা একটি আত্মঘাতী প্রবণতা। অথচ আমরা যাঁদের শ্রদ্ধা করি, সে বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ বা অমর্ত্য, প্রতিভা বাদ দিলে তাঁরা সবাই প্রবল পরিশ্রমীও।  আবার ব্যক্তিগত স্তরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হওয়ার কিছু ভাল দিক আছে— তাই বাঙালির আড্ডা, খাদ্যপ্রীতি, আতিথেয়তা, জীবনকে উপভোগ করার মানসিকতা, রসবোধ, এইরকম কিছু মূল্যবোধের গুণগ্রাহী না হওয়া মুশকিল।   

আসলে বাজার একটা যন্ত্রের মত। আপনি তাতে যে উপাদান দেবেন, সেইমতো ফল পাবেন। বাজারের সাথে মুনাফার আবশ্যক কোন সম্পর্ক নেই। ধনতান্ত্রিক সমাজেও অ-লাভমুখী (non-profit) এবং সামাজিক উদ্যমের (social enterprise) একটা বড় পরিসর আছে। বাংলা বাজারে, কোনও সাহিত্যিক যদি ঠিক করেন, তিনি শুধু লিখে জীবিকা অর্জন করবেন, আর কিছু করবেন না, তা কেন সম্ভব হবে না? যে কয়েকটা উদাহরণ মনে পড়ছে (যেমন, মহাশ্বেতা দেবী, হুমায়ুন আহমেদ) তাঁরা একটা পর্যায়ে বাণিজ্যিক সাফল্যের পরেই এই সিদ্ধান্ত নেন। বিদেশে পেশাদার লেখক হওয়ার উদহারণ অনেক বেশি, কিন্তু সেখানে সামাজিক নিরাপত্তাজাল নিশ্চয়ই একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে (যেমন, জে কে রাউলিং)। 

আমার মনে হয়, বাজারের উদ্যমের দিকটার সাথে বাঙালি মানসিকতা আর সংস্কৃতির সঠিক মেলবন্ধন কী করে করা যায়, সেটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে মুনাফামুখী মানসিকতা আর বাজারি সাফল্যের প্রতি আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত অস্বস্তিবোধকে স্বীকার করেই এগোতে হবে। 

ছবি এঁকেছেন চিরঞ্জিৎ সামন্ত  

Wednesday, February 23, 2022

কৃষিই ভিত্তি এবং দুর্বলতা


কৃষিই ভিত্তি এবং দুর্বলতা 

মৈত্রীশ ঘটক

আনন্দবাজার শতবার্ষিকী ক্রোড়পত্র, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০২২  


এখন ভাবলে অবাক লাগে যে, ষাটের দশকের গোড়ায় মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলির একটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ। তামিলনাড়ু আর পশ্চিমবঙ্গ ছিল তালিকার একদম উপরে, আর তাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল নেহাতই উনিশ-বিশ। তার পরে ছিল মহারাষ্ট্র। ষাটের দশক থেকেই সারা দেশের তুলনায় পিছোতে থাকে পশ্চিমবঙ্গ— পনেরোটি বৃহৎ রাজ্যের মধ্যে তার অবস্থান সত্তরের দশকের গোড়ায় দ্বিতীয় থেকে নেমে দাঁড়ায় ষষ্ঠ, তার পরের তিন দশকে তা অষ্টমে গিয়ে ঠেকে, এবং গত এক দশকে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে দশে। 

গত ষাট দশক ধরে রাজ্যের অর্থনৈতিক যাত্রাপথের আর একটি লক্ষণীয় দিক, যা নিয়ে ততটা আলোচনা হয়নি, তা হল রাজ্যের অর্থনীতিতে কৃষির ও শিল্পের আপেক্ষিক গুরুত্ব। ষাটের দশকে রাজ্যের মোট আয়ে কৃষির ও শিল্পের অনুপাত ছিল ৪০% আর ৩৪%, সারা দেশে তা ছিল ৫৩% ও ২২%, আর পরিষেবার অনুপাত উভয় ক্ষেত্রেই ছিল ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, সর্বভারতীয় পরিস্থিতির তুলনায় রাজ্যের আয়ে শিল্পের গুরুত্ব বেশি ছিল, কৃষির গুরুত্ব কম ছিল। সত্তরের দশকেও মোটামুটি একই ছবি। কিন্তু এই সময় থেকেই দেশের তুলনায় রাজ্যে শিল্পের আপেক্ষিক গুরুত্ব কমেছে, কৃষির আপেক্ষিক গুরুত্ব বেড়েছে— তাই রাজ্য ও দেশের মধ্যে কৃষি ও শিল্পের অনুপাতের ফারাক একটু কমেছে।  

পরের দুই দশকে কিন্তু এই ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আশির দশক থেকে গোটা দেশের তুলনায় রাজ্যের গড় আয়ে কৃষির গুরুত্ব বেশি এবং শিল্পের গুরুত্ব কম দেখা যাচ্ছে এবং পরবর্তী কালে এই প্রবণতা বেড়েইছে। সাম্প্রতিকতম দুই দশকে রাজ্যে এবং সারা দেশে কৃষির গুরুত্ব আগের তুলনায় খানিক কমেছে, এবং সেই অনুপাতে পরিষেবার গুরুত্ব বেড়েছে। শিল্পের অনুপাতের খুব একটা তারতম্য হয়নি। তা হলেও গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের আয়ে কৃষির অংশ (২৩%) সারা দেশের তুলনায় (১৮%) বেশ খানিকটা বেশি, শিল্পের অংশ ঠিক সেই অনুপাতেই কম (যথাক্রমে ২৬% ও ৩১%) থেকে গেছে। 

রাজ্যের অর্থনীতির এই যাত্রাপথের একটা কারণ অবশ্যই শিল্পে ক্রমে পিছিয়ে পড়া। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আর্থিক উদারকরণের নীতি চালু হওয়ার সময় অবধি রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রের বৃদ্ধির হার সারা দেশের থেকে লক্ষণীয় ভাবে কম ছিল। উদারকরণের পরের তিন দশকে গোটা দেশে, এবং রাজ্যে শিল্পে বৃদ্ধির হার বাড়ে— কিন্তু দেশের তুলনায় রাজ্যের বৃদ্ধির হার খানিক হলেও কম থেকে যাওয়ায়, তার আগের তিন দশকে হারানো জমি উদ্ধার করা যায়নি। 

কিন্তু যে সময় ধরে শিল্পের অবনতি হয়েছে, তার পাশাপাশি কৃষিতে রাজ্যে সারা দেশের তুলনায় আপেক্ষিক সাফল্য না দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে রাজ্যে কৃষি উৎপাদনের হার সারা দেশের গড় বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি ছিল। আর শুধু উৎপাদন নয়, আমরা যদি উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির হারও দেখি, তা হলে আশি ও নব্বইয়ের দশকে রাজ্যের বৃদ্ধির হার সারা দেশের গড় বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি। অথচ আমরা যদি ধানচাষ বা খাদ্যশস্যের উৎপাদনশীলতার মানের স্তর দেখি, তা কিন্তু ষাটের দশকের গোড়া থেকে শুরু করে এখন অবধি দেশের গড় উৎপাদনশীলতার মানের থেকে বেশি। দেশের গড়ের থেকে এগিয়ে থেকেও রাজ্যে কৃষির উৎপাদনশীলতার দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি হয়েছে, এটা উল্লেখযোগ্য। যদি উল্টোটা হত, অর্থাৎ পিছিয়ে থাকা অবস্থায় শুরু করে দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি হত, তা হলে বলা যেত যে, নেহাত পিছিয়ে ছিল বলেই এই উন্নতির অবকাশ ছিল। 

রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে উন্নয়নের প্রমাণ শুধু উৎপাদনশীলতাতেই নয়, অন্যান্য নানা মাপকাঠিতেও ধরা পড়েছে। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যে দারিদ্রসীমার নীচের জনসংখ্যা দেশের গড়ের তুলনায় অধিকতর হারে হ্রাস পেয়েছে সত্তরের দশকের গোড়া থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ অবধি। তাই রাজ্যের অর্থনৈতিক যাত্রাপথে শিল্পের ক্ষেত্রে হতাশাজনক রেকর্ডের পাশাপাশি কৃষিতে আপেক্ষিক সাফল্য উল্লেখযোগ্য।   

এর কারণ কী? একটা মত হল, আশি ও নব্বইয়ের দশকের পশ্চিমবঙ্গে কৃষির উৎপাদনশীলতা যেটুকু বেড়েছে তা মূলত সবুজ বিপ্লবের বিলম্বিত আগমনের ফল (উচ্চফলনশীল বীজ বা সেচের প্রসার), যার মূলে আছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ। কিন্তু এই যুক্তির সমস্যা হল, এটি গোটা পূর্বাঞ্চলের, এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের (যা আবহাওয়া, প্রকৃতি, কৃষিপ্রযুক্তি বা ভূমিব্যবস্থার দিক দিয়ে অনেকটাই এই রাজ্যের সঙ্গে তুলনীয়) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ধান চাষে উচ্চফলনশীল বীজের প্রসার পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে তুলনীয় হারেই হয়েছিল। অথচ পশ্চিমবঙ্গে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বাকি সারা ভারত এবং বাংলাদেশের থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি।  

বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কৃষি পরিসংখ্যান নিয়ে কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপের ফলে পরিসংখ্যানগত অতিরঞ্জনেরও কৃষির বৃদ্ধির হারকে এমন বেশি দেখাতে পারে, কোনও কোনও সমালোচক এ কথাও বলেছেন। ভিন্নতর পরিসংখ্যান ব্যবহার করে আমরা হিসাব করে দেখছি যে, ১৯৭৭-এর পর থেকে আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে কৃষির উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির হার তার আগের ও পরের পর্যায়ের তুলনায় বেশি। শুধু তা-ই নয়, তা একই সময়সীমার মধ্যে সারা ভারতের, ও বাংলাদেশের বৃদ্ধির হারের তুলনাতেও বেশি।   

আর একটি সম্ভাব্য কারণ হল বামফ্রন্ট সরকারের কৃষিনীতি। ১৯৭০-এর শেষভাগ থেকে শুরু করে ১৯৮০-র দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার ভাগচাষের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার করে, যা ‘অপারেশন বর্গা’ নামে পরিচিত। এই সংস্কারে ভাগচাষিদের ফসলের ভাগের পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং উচ্ছেদের ভয় থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন করা হয় এবং তার সঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা, আর সার, বীজ, ও চাষের অন্য উপাদানের সার্বিক বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতি। ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে  অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, পল গার্টলার আর আমি দেখাই যে, রাজ্যে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সীমিত ভূমিসংস্কারের সদর্থক ভূমিকা ছিল। তা হলেও আমাদের গবেষণা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, এর প্রভাব সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ২৮% ব্যাখ্যা করতে পারে; বাকিটার জন্যে দায়ী অন্যান্য নানা উপাদান। এই অন্য উপাদানগুলি কী, এবং তাদের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে পরবর্তী কালে গবেষণা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রণব বর্ধন এবং দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা। তাঁরা দেখাচ্ছেন যে, রাজ্য সরকারের মিনিকিট বিতরণ প্রকল্প কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।   

এখন একটা প্রশ্ন হল, অপারেশন বর্গা বা সীমিত ভূমিসংস্কারের কৃষির উপর সদর্থক প্রভাব থেকে যদি থাকেও, তার কারণ কী? ভাগচাষি ফসলের যত বেশি ভাগ পাবেন, এবং জমি থেকে তাঁর উচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা যত কমবে, ততই তিনি বেশি উদ্যমের সঙ্গে চাষ করবেন। সম্প্রতি একটি ‘র‌্যান্ডমাইজ়ড কন্ট্রোলড ট্রায়াল’ বা আরসিটি-তে দেখা হয়েছিল, ভাগচাষের ক্ষেত্রে চাষির ভাগে শস্যের অনুপাত বাড়ালে তার প্রভাব উৎপাদন বৃদ্ধির হারে কী প্রভাব পড়ে। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে শস্য ভাগের পরিমাণের অনুপাত বাড়ালে উৎপাদন বৃদ্ধির হার যথেষ্ট বাড়ছে, যা অনুপ্রেরক হিসেবে ফসলের ভাগের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করে। এই গবেষণাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপর যে প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে তা ‘আরসিটি’-পূর্ব জমানায় করা আমাদের গবেষণার ফলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।  

তবে মনে রাখতে হবে যে, অপারেশন বর্গা কোনও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়নি, তাকে গ্রামবাংলায় পট-পরিবর্তনের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে নানা উপাদানের বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতিই হোক, তার আগের পর্যায়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসানই হোক, বা গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পাল্লা দরিদ্রদের দিকে ঝোঁকার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে শ্রম, পুঁজি এবং জমির বাজারে কিছু গুণগত পরিবর্তনের ফলই হোক, এগুলো অপারেশন বর্গা ও সীমিত ভূমিবণ্টনের পরিপূরক উপাদান এবং এদের সমন্বিত প্রভাব কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সহায়ক ছিল।  

কৃষিতে রাজ্যের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সমস্যা হল, উন্নয়নের ধ্রুপদী তত্ত্ব বলে যে, বিভিন্ন দেশে, অঞ্চলে ও কালে সময়ের সঙ্গে কৃষির গুরুত্ব কমে, শিল্পের গুরুত্ব বাড়ে, এবং পরিষেবার গুরুত্ব আরও বাড়তে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু কোনও একটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির মাধ্যমেই শুধু হয় না, তার জন্যে প্রয়োজন মূল যে অর্থনৈতিক উপাদানগুলি— অর্থাৎ শ্রম, পুঁজি, এবং ভূমি— সেগুলো নতুন ধরনের প্রয়োজন মেটাতে নতুন ভাবে বিন্যস্ত হয়, অধিক থেকে অধিকতর মূল্যের উৎপাদনে নিয়োগ করার নিরন্তর প্রক্রিয়ায়, যার গতি সচরাচর কৃষি থেকে শিল্প এবং পরিষেবার দিকে। এ ভাবেই শহরাঞ্চলের প্রসার হয়ে থাকে। বর্তমান দুনিয়ার ধনী দেশগুলো ঐতিহাসিক ভাবে এই সব পর্ব উতরে তবেই আজকের জায়গায় এসে পৌঁছেছে।  

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে রাজ্যের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ অবশ্যই খানিক বিপরীতমুখী। সাম্প্রতিক কালেও— যেমন, গত এক দশকে— দেশের তুলনায় রাজ্যে কৃষিতে বৃদ্ধির হার দেশের গড়ের থেকে বেশি থেকেছে, সার্বিক বৃদ্ধির হার কম হওয়া সত্ত্বেও। কিন্তু আয় এবং কর্মসংস্থানের দিক থেকে দেখলে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার না বাড়লে সার্বিক বিচারে রাজ্যের অর্থনৈতিক পশ্চাদপসরণ অব্যাহত থাকবে। 

রাজ্যের অর্থনীতির সার্বিক অগ্রগতির পথে অনেক অন্তরায়। তবে, এর একটা বড় কাঠামোগত কারণ হল শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যে জমির সমস্যা। বামফ্রন্টের সীমিত ভূমিসংস্কার শুরু হওয়ার তিন দশক পরে সিঙ্গুরে রাজ্যে শিল্পায়নের পথে মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াল জমি-অধিগ্রহণের সমস্যা।  

সমস্যাটা সারা দেশের জন্যে প্রযোজ্য হলেও জনসংখ্যার তুলনায় ভূমির অপ্রতুলতা এবং জনসংখ্যার চাপের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমির ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে বিভাজিত হওয়ার প্রবণতা রাজ্যের ক্ষেত্রে আরও প্রকট। তার উপর সীমিত ভূমিসংস্কারের ফলে ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমি আসা এবং বর্গা আইনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের ভাগচাষিদের কাছে জমি বেচে দেওয়ার কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে। সাম্প্রতিক কৃষি সেনসাস থেকে জানা যাচ্ছে যে, রাজ্যের কৃষিতে নিয়োজিত জমির গড় পরিমাপ সত্তরের দশকের গোড়ার তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে কমেছে প্রায় ৪০%, এবং দেশের বর্তমান গড়ের সঙ্গে তুলনা করলে তা রাজ্যের তুলনায় দেড় গুণ বেশি। একই সঙ্গে কৃষিতে নিযুক্ত জমিতে প্রান্তিক চাষিদের (যাদের জমির আয়তন এক হেক্টর বা তার কম) অনুপাত সত্তরের দশকের গোড়ায় ছিল ৬০%, যা ২০১৫-১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩%— বর্তমানে প্রান্তিক চাষিদের সর্বভারতীয় অনুপাত ৬৮%।        

এখন জমি যত বিভাজিত হবে, সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের এক সঙ্গে জমি বিক্রি করতে রাজি করানো ততই কঠিন হবে। আর একটা সমস্যা হল জমির বাজার ঠিক আর পাঁচটা বাজারের মতো নয় যে, দাম বাড়লে জোগান বাড়বে এই সরল যুক্তিটা খাটে। জমি শুধু রোজগারের উৎস নয়, জমির মালিকানা একটা বড় ধরনের আর্থিক নিরাপত্তাও দেয়। ক্ষুদ্র জমির মালিকদের কাছে এই দ্বিতীয় কারণটি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তাই জমির দাম বাড়লে তাঁরা বরং বেশি করে জমি আঁকড়ে থাকতে পারেন, তাই বাড়ার বদলে জমির জোগান কমেও যেতে পারে। ধনী চাষির হাতে উদ্বৃত্ত জমি আছে, তাই দাম বাড়লে তাঁদের কাছে থেকে জমির জোগান বাড়বে, কিন্তু সার্বিক জোগান নির্ভর করবে জমির বণ্টনের উপর। রাজ্যের সীমিত ভূমিসংস্কার এবং জমিতে জনসংখ্যার চাপ, এই দুই কারণের ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বেশি, তাই দাম বাড়লে জোগান না বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। আমাদের সমীক্ষা থেকে দেখছি, যে পরিবারের হাতে জমির পরিমাণ তুলনামূলক ভাবে কম, এবং যাঁদের কৃষির উপর নির্ভরশীলতা যত বেশি, তাঁরা জমি বেচতে ততই অনিচ্ছুক। এখানে রাজ্যের অর্থনীতিতে একটা বিষচক্র কাজ করেছে— শিল্প হচ্ছে না বলে বিকল্প কম, আবার বিকল্প কম বলে জমির উপর নির্ভরতা প্রবল, আর তাই শিল্প হচ্ছে না। 

 ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ স্লোগানটি রাজ্যে কার্যকর হতে পারেনি। বরং এটাকে পাল্টে বলা যেতে পারে কৃষি একই সঙ্গে রাজ্য অর্থনীতির শক্তি এবং দুর্বলতা। আর এর একটি প্রধান কারণ হল, জমি নিয়ে জটিলতা। অদৃষ্টের পরিহাস হল যে, আগের জমানায় সীমিত ভূমিসংস্কারের সাফল্য এই প্রবণতাকে আরও প্রকট করে দিয়েছে।

Sunday, November 28, 2021

Translation of a favourite poem by Bishnu Dey

Long ago I sang songs in your praise,

a smitten minstrel.

The lyrics have faded away over many monsoons;

only memories remain.


Cast-iron memories

that won't perish in sun or rain.

Only lingering pain

coats the nerve-ends

In a dazzle of rust.

[ Long Ago, Bishnu Dey]

Translated by Maitreesh Ghatak and Manishita Dass

The original is below: 

সে কবে গেয়েছি আমি তোমার কীর্তনে

কৃতার্থ দোহার 

পদাবলী ধুয়ে গেছে অনেক শ্রাবণে ;

স্মৃতি আছে তার।


রৌদ্র-জলে সেই-স্মৃতি মরে না, আয়ু যে

দুরন্ত লোহার ।

শুধু লেগে আছে মনে ব্যথার স্নায়ুতে

মর্চের বাহার ।

[“সে কবে”, বিষ্ণু দে] 

Sunday, October 31, 2021

অমিয় চক্রবর্তী, বিনিময়

 In Exchange, Amiya Chakrabarty


Translated from the original by Maitreesh Ghatak & Manishita Das





Instead, you got

All of that quiet pond

A mirror sculpted in blue

Water radiant with light

The shadow branch

Arched by flowers,

A purple cloud’s floating sail

The heart fills up

The solitary heart, it can grasp it all



Instead, you got

White thoughts of nought

The dust on open roads

Winds out of tears --

Calling you in a familiar voice from afar

On an afternoon when all was lost

With no looking back

Is that what you left behind?

তার বদলে পেলে—
সমস্ত ঐ স্তব্ধ পুকুর
নীল-বাঁধানো স্বচ্ছ মুকুর
আলোয় ভরা জল—
ফুলে নোয়ানো ছায়া-ডালটা
বেগুনি মেঘের ওড়া পালটা
ভরলো হৃদয়তল—
একলা বুকে সবই মেলে ৷৷

তার বদলে পেলে —
শাদা ভাবনা কিছুই-না-এর
খোলা রাস্তা ধুলো পায়ের,
কান্না-হারা হাওয়া —
চেনাকণ্ঠে ডাকলো দূরে
সব-হারানো এই দুপুরে
ফিরে কেউ-না-চাওয়া ৷
এও কি রেখে গেলে ৷৷

[অমিয় চক্রবর্তী, বিনিময়]

Saturday, August 7, 2021

কথার কথা - ট্রোল কাহিনী

 কথার কথা - ট্রোল কাহিনী 

ডাকবাংলা.com-এ সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রোল নিয়ে লেখা (https://daakbangla.com/2021/07/kathar-katha/) 



[অর্থনীতি ও অনর্থনীতি, অর্থশাস্ত্র ও শব্দের অর্থানুসন্ধান, অর্থকরী ও অনর্থক, অর্থময় ও অর্থহীন সমস্ত বিষয় নিয়ে খামখেয়ালি চিন্তাভাবনা]

আলোচনা হচ্ছিল ট্রোল নিয়ে। এক অর্থে ট্রোল হল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপকথার খানিক মানুষ-খানিক রাক্ষস বা দৈত্য গোছের প্রাণী, যারা বেশ দুষ্ট প্রকৃতির এবং মানুষদের নানারকম ভাবে হেনস্থা ও উপদ্রব করা তাদের কাজ। ট্রোল দৈত্যাকার ও হিংস্র হয় (যেমন হ্যারি পটার-এ), আবার খর্বাকৃতি ও খানিক মিচকে প্রকৃতিরও হয়। গুটিয়া দেও বলে এক খুদে দৈত্য ছিল, শান্তা ও সীতা দেবীর হিন্দুস্থানী উপকথায়, নামটা বেশ মনে ধরেছিল। আমার কল্পনায় ওকে খানিকটা ট্রোলের মতো দেখতে। আর মিল পাই খোক্কসের সাথে (‘ঠাকুমার ঝুলি’-তে ছবি আছে), যা হল রাক্ষসের ছোট সংস্করণ। খোক্কস কি খোকা রাক্ষস? কে জানে! যাই হোক, ট্রোলদের খোক্কস বলাই যায়।  

আন্তর্জালিক দুনিয়ায় এক নতুন প্রজাতির খোক্কসের উদ্ভব হয়েছে। এদের কাজ হল ঝগড়া বাধানো এবং করা। আপনি কোনও লেখা লিখলেন অনলাইন কোনও পত্রিকায় বা ফেসবুকে খানিক মনের-প্রাণের কথা লিখলেন, অমনি এই ট্রোলেরা এসে আপনাকে জ্বালাতন করা শুরু করবে— গায়ে পড়ে ঝগড়া, অহেতুক বিতর্ক উস্কে দেওয়া থেকে শুরু করে নেহাতই গালিগালাজ করাই এদের কাজ। মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধান বলছে ট্রোলের আধুনিক অর্থ হল ‘to antagonize (others) online by deliberately posting inflammatory, irrelevant, or offensive comments or other disruptive content’— অর্থাৎ খানিক নারদ, খানিক খোক্কস, আর খানিক ঝগড়ুটে।

ঘটনা হল আন্তর্জালে এই ঝগড়ুটেদের বা বৈদ্যুতিন গুন্ডাদের খুবই বাড়বাড়ন্ত। রাজনৈতিক দলগুলির এখন আইটি সেল থাকে— যাদের কাজ শুধু প্রচার নয়, বিপক্ষের মতকে বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতপ্রকাশকারীকে সরাসরি আক্রমণ করা। তাদের অনেকের এটাই পেশা (এই নিয়ে স্বাতী চতুর্বেদী-র I Am a Troll: Inside the Secret World of the BJP’s Digital Army, Juggernaut Books, 2016 বইটি অবশ্যপাঠ্য) আবার অনেকে এই কাজটা একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীদের মতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে করেন। 

এক-একটা কথা অদ্ভুত স্মৃতি উস্কে দেয়। ‘পেশাদার ঝগড়ুটে’ কথাটা মনে করিয়ে দিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘মাধব ও তার পারিপার্শ্বিক’ উপন্যাসে বর্ণিত একটি ঘটনার কথা। তাতে এক চরিত্র ছিল, একজন বয়স্ক মহিলা, যিনি পেশাদার ঝগড়ুটে। তিনি এরকম একটা কাজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন কিন্তু একনাগাড়ে গালিগালাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় তাঁর সহকারিণীদের বলছেন যে আমি একটু পান খেয়ে জিরিয়ে নিই, তোরা এবার ধর এবং তারা গালিগালাজে কিছু ভুল করে ফেলায় (যথা, মুখে কুট নয়, কুঠ অর্থাৎ কুষ্ঠ হয়েছে) এবং যথাস্থানে পা-দাপানো ঠিকঠাক না হওয়ায় তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের মতোই দুঃখপ্রকাশ করছেন… কবে শিখবি এসব! এঁর নাম ঝাড়ুনি, যা মহাশ্বেতা দেবীর ‘রুদালী’ গল্পে পেশাদার বিলাপকারীর মতো তাঁর পেশাগত নাম বলেই ধরে নেওয়া যায়। পেশাদার ঝগড়ুটে হিসেবে ‘ঝাড়ুনি’ নামটি বেশ উপযুক্ত। এর পুংলিঙ্গ ‘ঝাড়ুয়া’ বা ‘ঝেড়ো’ রাখা যেতে পারে, কারণ ঝাড়ুদার বললে অন্য পেশার কথা মনে হবে যার সাথে এর কোন মিল নেই, আর জঞ্জাল পরিষ্কার করা একটি অতীব প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর কাজ যে, দুটোর কোনওটাই পেশাদার ঝগড়ুটেদের ক্ষেত্রে খাটে না।

কিন্তু ঝাড়ুনি বা ঝেড়োই বলি বা লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ হিসেবে, খোক্কস— আর তারা পেশাদারই হোক বা স্বেচ্ছাসেবক— এমন কিন্তু নয় যে তারা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, যাদের একবার চিহ্নিত করে দুয়ার এঁটে বাইরে রাখলেই এড়ানো যায় এবং সব সমস্যা মিটে যায়। আমাদেরই চেনা-পরিচিত মহলে তাদের অনেক সময় দেখা যায়। ভূতপ্রেতের মতো খোক্কসরাও যে কোনও সময় যে কারোর ওপর ভর করতে পারে।

আসলে সমাজমাধ্যম যেমন আপাতবাস্তব এই পরিসরে চটজলদি সৌহার্দ্য ও আলাপচারিতার সুযোগ করে দিয়েছে, আবার একই সাথে কিছু প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও বিধিনিষেধের রাশও আলগা করে দিয়েছে। যে-ভাষা সর্বসমক্ষে ব্যবহার করতে পাকা ঝাড়ুনিরাও ইতস্তত করবে, এক যান্ত্রিক প্রাচীরের সুরক্ষাবলয় যেন মেঘের আড়াল থেকে সেই ভাষার অস্ত্রনিক্ষেপ করার অবাধ স্বাধীনতা করে দিয়েছে এই আধুনিক মেঘনাদদের।

প্রশ্ন হল, এটা করে তাদের কী লক্ষ্যসাধন হয়? কাউকে আক্রমণাত্মক ভাবে কথা বললে তার মতপরিবর্তনের কোনওই সম্ভাবনা নেই, বড়জোর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার জন্যে লোকে চুপ করে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, অন্যরা এটা দেখে আগেভাগেই বিতর্কিত কোন বিষয়ে মৌনব্রত অবলম্বন করাই মঙ্গল বলে চুপ করে থাকে।

আসলে মারামারি করার মতো ঝগড়া করারও একমাত্র লক্ষ্য শক্তি প্রদর্শন করে নিজের আধিপত্য জাহির করা, অন্য পক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়া। ঝগড়ায় কোনও রকমে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করাটাই যথেষ্ট। তাই দমে বা গলার জোরে টান না পড়লে কোনও পক্ষই থামতে পারেন না, কারণ থামা মানেই হার-স্বীকার। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরই আরেকটি উপন্যাসে (‘আশ্চর্য ভ্রমণ’) একটি ঝগড়ার অনবদ্য বিবরণ আছে, যেখানে বাসে দুই যুযুধান যাত্রী একনাগাড়ে ঝগড়া করে কথা (এবং সম্ভবত দম) ফুরিয়ে যাওয়ায় পরস্পরের প্রতি ‘অ্যাঁঃ অ্যাঁঃ অ্যাঁঃ’ আর ‘ঙ ঙ ঙ!’ বলে যাচ্ছিল। অথচ যুক্তি বা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে খণ্ডন করতে পারলে, গলা তোলার বা অর্থহীন চেঁচামেচি বা গালমন্দ করার দরকার হয় না। বাংলার সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখে মনে হত, একমত না হলে একটা লেবেল লাগিয়ে দিলেই যুক্তি, বুদ্ধি, তথ্য কোনও কিছু ব্যবহার করার দায় থাকে না। আমি আপনার সাথে একমত নই, অতএব আপনি অতি দুষ্ট। কিন্তু বিজেমূল বা বামরাম বা দালাল এসব কথা না বলে ‘লিঃ লিঃ’ বা ‘হোঃ হোঃ’ বা ‘ছোঃ ছোঃ’ বললে আরও তাড়াতাড়ি নিজের মতটা প্রকাশ করা যায় না? আসলে পেশার দায়ে পরীক্ষার খাতা বা প্রবন্ধ পড়ে মূল্যায়ন করার দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি: সারশূন্য বক্তব্য যত সংক্ষিপ্ত হয়, ততই মঙ্গল।

কিন্তু, ঝগড়া আর তর্ক তো এক নয়। লোকে তর্ক করে কেন?

ঝগড়া যদি মারামারির সাথে তুলনীয় হয়— অর্থাৎ যেনতেন প্রকারেণ প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করাই একমাত্র লক্ষ্য, বিতর্ক সেখানে ক্রীড়ার মতো— জেতা মূল উদ্দেশ্য হলেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, না হলে খেলা ভণ্ডুল। বিতর্কে তাই যুক্তি বা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে খণ্ডন করতে হয়— গলা তোলা, অর্থহীন চেঁচামেচি বা গালমন্দ করা কার্যত পরাজয় স্বীকার করার নামান্তর। তাই এখানে ট্রোল বা খোক্কসরা যে রূপ নেয় তা আরেকটু সভ্যভব্য এবং তাই তাদের চট করে সব সময়ে চেনা যায় না। আর তর্কে জড়িয়ে পড়লে আমাদের মধ্যেও কোনও খোক্কস জেগে উঠতে পারে যার একমাত্র লক্ষ্য হল বিপক্ষকে পর্যুদস্ত করা। খেলায় যেমন স্থূল না হলেও সূক্ষ্ম ধরনের ফাউল আছে এবং নানা রকম অসাধু উপায় আছে, বিতর্কের ক্ষেত্রেও এরকম কিছু কায়দা আছে যা এই ছদ্মবেশী খোক্কসেরা ব্যবহার করে। যেমন ধরুন আপনি কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও কাজের সমালোচনা করলেন। এর বিরোধিতা করতে গেলে ঘটনাটির সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, অথবা কী কারণে এই কাজ করা হয়েছে তার ঠিকমতো বিচার-বিবেচনা করলে কাজটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে যতটা অসমর্থনযোগ্য মনে হচ্ছে ততটা মনে হবে না— এরকম মর্মেও একটা যুক্তি খাড়া করা যেতে পারে। যিনি সমালোচনা করছেন তিনি পুরোপুরি না মানলেও, অন্তত বিপক্ষের মতামতটা কী শুনি, এই ভেবে আলোচনা হতে পারে।

অথচ, সমাজমাধ্যমে নানা বিতর্কে তার থেকে বেশি যা শুনবেন সেই কুতর্কের কতগুলো পরিচিত কায়দা আছে । একটার উদাহরণ দিই, যেটার নাম দেওয়া যায় ‘তার-বেলা-পনা’ (whataboutery)। মানে, মানছি কাজটা ঠিক নয় কিন্তু অন্যরা যখন এটা করে, তার বেলা? যেমন : ‘এই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত? আগের জমানা কি ধোয়া তুলসীপাতা ছিল?’ এই ধরনের যুক্তির দুটো প্রধান সমস্যা। এক, মূল বক্তব্যের ওপর আর তর্কটা সীমাবদ্ধ থাকছে না, সেটা হচ্ছে সমালোচকের পক্ষপাত নিয়ে এবং তাই সমালোচনাটা কার্যত অবৈধ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুই, এর অন্তনির্হিত বক্তব্য হল, কোনও দলই ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তাই এসব আলোচনার অর্থ একমাত্র দল বা মতাদর্শগত পক্ষপাতের জায়গা থেকেই লোকে করে। এটা বেশ পিচ্ছিল একটা যুক্তি, কারণ তাহলে কোনওকিছুর তুলনামূলক ভাল-মন্দ বিচার করারই অর্থ হয় না। সাহিত্যে ‘তার-বেলা-পনা’র বিখ্যাত উদাহরণ হিসেবে মনে করে দেখুন অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই বিখ্যাত ছড়া:

‘তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো।
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?’
(‘খুকু ও খোকা’, ১৯৪৭)

এখানে যুক্তিটা খানিকটা খাটে কারণ দুটি অপরাধ তুলনীয় নয়, সবাই মানবেন যে তেলের শিশি ভাঙাটা তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু কোনও সরকারের আমলে দুর্নীতি বা রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে কথা উঠলেই যদি উত্তর হয়, অন্য জমানাতেও হয়েছে, তাহলে তার মানে দাঁড়ায় যে ‘এসব হয়েই থাকে’, ফলত রাজনৈতিক জমানা নির্বিশেষে এই অবাঞ্ছিত বিষয়গুলি কী করে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, সেই আলোচনা শুরু হবার অবকাশ থাকে না এবং স্থিতাবস্থা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই— এই ধরনের নৈরাশ্যের বোধ ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই হয় না।

যারা রাখঢাক না করে প্রকাশ্যেই ট্রোলিং করে, তাদের কাজই হল বিপক্ষকে গলার জোরে চুপ করিয়ে দেওয়া আর অন্যদের কাছে উদাহরণ খাড়া করা যে এদিক-ওদিক কথা বললে তার কী ফল হতে পারে। কিন্তু যারা প্রচ্ছন্নভাবে (এবং কখনও হয়তো সচেতন না হয়েই) বিতর্কে বিপক্ষের বক্তব্য তার-বেলা-পনা-র মতো কিছু প্রচলিত কায়দায় থামিয়ে দেয়, তারাও কার্যত বিতর্ক ও আলোচনার পরিসরকে সংকীর্ণ করে দেয়। এর অনিবার্য পরিণতি হল আলাপ-আলোচনার বৃহত্তর পরিসর থেকে সরে এসে সহমতসম্পন্ন মানুষে ভরা প্রতিধ্বনি-কক্ষে আটকে থাকা।  

এর বিপদ হল টিকা না নিলে যেমন কিছু অসুখ হতে বাধ্য, সেরকম দলমতনির্বিশেষে খোলাখুলি আলোচনার পরিসর সংকীর্ণ হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেলে ক্ষমতাসীন (সে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই হোক বা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই হোক) পক্ষের ভুলত্রুটি সংশোধনের অবকাশ থাকে না আর তার কুফল হয় দীর্ঘমেয়াদি। যতই হোক, কোনও পক্ষেরই (সে দলই হোক বা মতবাদ) সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে সঠিক হওয়া সম্ভব নয়, আর তাই বিতর্ক ও আলোচনার কোনও বিকল্প নেই। সবাই সব বিষয়ে একদম একমত হলে, কথাবার্তা একদম পানসে হয়ে যায়। শুধু তাই না, তার থেকে কারোর কিছু শেখারও থাকে না, বদ্ধ ডোবার মতো পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন বা  বিবর্তনের কোনও সম্ভাবনা থাকে না।

তাহলে উপায় কী? বিতর্ক যাতে ঝগড়া না হয়ে দাঁড়ায়, এবং প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন খোক্কসদের দাপটে যাতে আলোচনা বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্যে খেলার মাঠে যেমন সেরকম সমাজমাধ্যমেও নিজে থেকেই কিছু রীতিনীতির প্রবর্তন আবশ্যক, ঠিক পাড়ার খেলাতেও যেমন দরকার হয়, যার জন্যে বহিরাগত কোনও রেফারি বা আম্পায়ারের দরকার নেই।

মনে হতে পারে, এটা কি বাস্তবসম্মত? পৃথিবীর সর্বত্র রাস্তাঘাটে, দোকানে, বাজারে, পাড়ায়— সবজায়গাতেই তো এরকম কিছু নিয়মকানুন (যেমন, লাইনে দাঁড়ানো) স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই গড়ে ওঠে, তা হলে নেটদুনিয়ায় হবে না কেন?

আজকের মতো শেষ করি সমাজমাধ্যম এবং তার তর্কবিতর্ক ও ঝগড়ার জমজমাট আসর নিয়ে এই ছোট্ট গুণগানটি দিয়ে (কবিগুরুর প্রতি যথাযথ মার্জনাভিক্ষা-সহ):

কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই
চাই বা নাহি চাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
কর্মব্যস্ত দিবসমাঝারে
কর্মনাশা হে বন্ধু মোর,
তর্কসায়রে তুফান তুলিয়া
আপনে করিলে পর।

ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী

 

 

Sunday, May 16, 2021

মৃণাল সেন-এর ৯৮-তম জন্মদিন উপলক্ষে কুণাল সেনের লেখা

কুণাল-দার সাথে মুখোমুখি আলাপ শিকাগো-তে, আন্দাজ ১৯৯৭ সালে। পাঠভবন স্কুল এবং একাধিক প্রজন্মব্যাপী পারিবারিক চেনাজানার কারণে যোগসূত্র হয়ে ছিল আগে থেকেই। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব হতে কোন সময় লাগেনি। শিকাগো-র হাইড পার্ক পাড়ায় একই ফ্ল্যাটবাড়িতে পড়শী হবার সুবাদে কুণাল-দা/নিশা-দির বাড়িতে অনেক আড্ডার সুখস্মৃতি আছে। কুণাল-দার মত জমিয়ে গল্প বলার ক্ষমতা খুব অল্প লোকের আছে।

কুণাল-দার বাবা, চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনের ৯৮-তম জন্মদিন উপলক্ষে লেখা এই লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো, আবার একটু মন খারাপও হল। সত্যি, আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াসে অবহেলা এত দ্রুত এত ঐশ্বর্য ফিকে হয়ে যেতে দেয়.....
‘কভি দূর কভি পাস’- কভি পাস থে, লেকিন দূর-ই রহে গ্যয়া ।

https://www.anandabazar.com/entertainment/kunal-sen-writes-on-his-father-eminent-director-mrinal-sens-birthday-dgtl/cid/1281406?fbclid=IwAR0BQPc1DLgylIJHh7K-7b_EpHLrJxwhUlOuZIiHGybMk7dMmljAv5G_vgc


Monday, April 26, 2021

শীর্ণ ছায়া - রণজিৎ দাশ

শীর্ণ ছায়া 

রণজিৎ দাশ 

সমস্ত মুক্তির পথে অন্ধ ভিখারির মত

ভালোবাসা ঠায় বসে থাকে।

পথের ওপরে তার ক্ষুদ্র, শীর্ণ ছায়া

নিঃশব্দে ডিঙিয়ে যেতে হয়।

সমস্ত মুক্তির পথে, এটুকুই, মূল পরিশ্রম। 


Shrivelled Shadow

Ranajit Das


On all paths to salvation

Love sits still

like a blind beggar


You have to cross

its small shrivelled shadow

Quietly

to pass through

On all paths to salvation, this is the main struggle.