Friday, January 24, 2020

অসংগঠিত ক্ষেত্র আর কেইন্সীয় সামগ্রিক চাহিদার সমস্যা



কথাটা হচ্ছিল দক্ষিণ কলকাতার একটা পরিচিত ওষুধের দোকানে, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এমনিতে সন্ধ্যেবেলা দোকানটায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এবারে একদম ফাঁকা। দোকানের মালিক বলছিলেন যে বিমুদ্রাকরণের পর থেকে তাঁর দৈনিক বিক্রী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, এবং এই হারে চললে কিছুদিন বাদে কমে তা অর্ধেক দাঁড়াবে। বললেন আশপাশের সব দোকানের একই অবস্থা, এবং এই অবস্থায় টিকে থাকার জন্যে অনেকেই ভাবছেন দোকানের কর্মচারী ছাঁটাই করার কথা। “আমাকেও তাই করতে হবে মনে হচ্ছে”, তিনি বললেন। “কিন্তু ওষুধ ছাড়া লোকের চলছে কি করে?” শুনে তাঁর মন্তব্য "লোকে খেতে পেলে তবে তো ওষুধ কিনবে!” বললেন বিমুদ্রাকরণ আর জিএসটির ধাক্কায় সাধারণ মানুষ আর ছোট ব্যবসায়ীদের অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়, অচ্ছে দিন তো দূরের কথা, দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  




নেহাতই একজনের অভিজ্ঞতা এবং মতামত। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে কেইন্স যে সামগ্রিক চাহিদার তত্ত্ব পেশ করে ধ্রুপদী অর্থনীতির জগতে সাড়া তুলেছিলেন ১৯৩০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী মহামন্দার সময়, তার মূল যুক্তিটা খুব পরিষ্কার ধরা পড়ে। আয় কমলে ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা কমে, ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা কমলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাঁটা পড়ে, তখন সেখানে বিনিয়োগ কমা এবং কর্মীদের ছাঁটাই করার প্রবণতা বাড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষের আয় কমে যার ফলে চাহিদা আরো কমে - এই হলো মন্দার বাজারে কেইন্সীয় বিষচক্র। এর থেকে বেরোবার উপায়? সরকার ব্যয় বৃদ্ধি করলে (বা করের বোঝা কমালে) মানুষের আয় বাড়বে, তার থেকে ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়বে, আর অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগবে, তার থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু মুশকিল হল, এর ফলে বাজেটের ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির আশংকা বাড়বে। তা ছাড়া সরকারের ঋণের বোঝা এমনিতেই যথেষ্ট বেশি, তাই আরও ঋণ নেবার পথও সীমিত।



ওষুধের দোকানের গপ্পো, কেইন্সীয় তত্ত্ব ছেড়ে যদি তথ্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে ভারতীয় অর্থনীতির বেহাল অবস্থা নিয়ে এই মুহূর্তে খুব একটা দ্বিমত হবার সুযোগ নেই। মূল্যবৃদ্ধি হারের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় আয়ের বাস্তব বৃদ্ধির হার যদি দেখি, সেটা গত আর্থিক বছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯%। মাত্র এক বছর আগে জাতীয় নির্বাচনের আগে এই হারের যে আগাম হিসেব সিএসও (সেন্ট্রাল স্ট্যাটিসটিকাল অফিস) দিয়েছিল, তা ছিল ৭%, এবং তখনো বলা হচ্ছিল, সেটা বিশ্বের সর্বাধিক বৃদ্ধির হারের মধ্যে পড়ে।  বর্তমান হিসেব অনুযায়ী এক দশকেরও বেশি আগে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সময়ের পর এটাই সর্বনিম্ন বৃদ্ধির হার। আর সরকারি রাজস্ব এবং ব্যয় যেহেতু বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতেই হয়, তাই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করে যদি জাতীয় আয়ের আপাত বৃদ্ধির হার দেখি, তা হল ৭.৫%, যা ১৯৭৮-এর পরে নিম্নতম বৃদ্ধির হার। বৃদ্ধির হার নিয়ে বড়াই করা বা বাড়িয়ে বলার সমস্যা হল, কোন না কোন সময় তো সরকারের নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসেবও তো করতে হয়, তখন যদি রাজস্ব বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক না হয়, বাজেটের সব হিসেবও তালগোল পাকিয়ে যাবে। তাই এই মুহূর্তে সরকার যে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তার জন্যে অতি বড়ো সমালোচকও সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য - যতই হোক দেশের অর্থনীতির সমস্যার প্রভাব সবার ওপরে পড়ে। 



কিন্তু সমস্যাটার গুরুত্বটা পুরোপুরি স্বীকার না করলে তো  সমাধান বেরোনো মুশকিল। এই প্রসঙ্গে সরকারী বা সরকারের পরামর্শদাতা অর্থনীতিবিদদের কিছু কিছু উক্তি যা কানে আসছে তা খুব একটা ভরসা যোগাচ্ছেনা। কেউ বলছেন, এ তো বাণিজ্য চক্রের ওঠাপড়া, কেউ বলছেন, সারা পৃথিবী জুড়েই তো বৃদ্ধির হার কমেছে, কেউ আবার বলছেন দেশের বৃদ্ধি তখনই তো হবে যদি রাজ্যগুলোর বৃদ্ধি হয়। ঘটনা হল, এটা ঠিকই যে যাহাই পড়ে তাহাই কোন না কোন সময় আবার ওঠে, কিন্তু টানা ছয় ত্রৈমাসিক পর্ব জুড়ে বৃদ্ধির হার যে ক্রমাগত নিম্নগামী, গত আড়াই দশকে তার সমতুল্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আর সত্যি কি সর্বত্রই বৃদ্ধির হার নিম্নগামী? না, ভারতের বৃদ্ধির হার আর সারা পৃথিবীর বা নিম্ন-আয়ের দেশগুলির গড়  বৃদ্ধির হার তুলনা করলে দেখা যাবে যে ২০১৬ সালের পর থেকে ভারতের বৃদ্ধির হার আপেক্ষিকভাবেও নিম্নগামী। আর রাজ্যগুলোর বৃদ্ধির হার দেশের বৃদ্ধির হারকে যে প্রভাবিত করে একথাটা তো সংজ্ঞা অনুযায়ীই সত্যি - যেমন সত্যি যে সারাদেশের আয় বৃদ্ধির হার শেষ বিচারে প্রতি নাগরিকের আয় বৃদ্ধির হারের ওপর নির্ভর করবে। সরকার তো আর মজন্তালী সরকার নয়, যে শুধু হিসেব রাখবে, খাজনা আদায় করবে, আর ধমকধামক দেবে! এ নেহাতই খারাপ ফলাফলের মুখোমুখি হয়ে দায়িত্ব এড়াবার যুক্তি।



তা হলে করণীয় কি?



প্রথমে সমস্যাটার গভীরতা অনুধাবন করতে হবে। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (National Sample Survey, বা NSS) ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয়ের যে হিসেব পাওয়া যায়, তা অনুযায়ী ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে গড় মাথাপিছু জাতীয় ব্যয় কমেছে প্রায় ৪%। গ্রামাঞ্চলে এই হ্রাসের হার ৮.৮%, আর শহরাঞ্চলে স্বল্প (২%) হারে বৃদ্ধি হয়েছে। অথচ জাতীয় আয়ের যে হিসেব আমরা পাই জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান (National Accounts Statistics, বা NAS) দফতর থেকে, সেখানে গড় ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয়ের বৃদ্ধির হার প্রায় ৬%। তা তো হতেই হবে, কারণ ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয় জাতীয় আয়ের প্রায় ৬০%। তাই যেখানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে (জাতীয় আয়ের ৩০%) বৃদ্ধির হার সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ১% হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয় যথেষ্ট হারে না বাড়লে ৫% হারে জাতীয় আয় আর বাড়বে কি করে?

প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং রিসার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর সি রঙ্গরাজন সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে বলেছেন, এই দুই সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে ব্যবধান গত কয়েক দশক ধরে  এতটাই বেড়ে চলেছে যে সেটা কেন ঠিক মত বোঝার জন্যে উপযুক্ত  বিশেষজ্ঞমণ্ডলী নিয়োগ করার আশু প্রয়োজন। দুই সংস্থার কারোরই পরিসংখ্যানব্যবস্থা সমস্যামুক্ত নয় একথা সর্বজনবিদিত, কিন্তু সরকার শুধু এনএসএস-এর রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেয়নি এর নানা সমস্যা আছে বলে। তা থাকতেই পারে, কিন্তু তার উত্তর তো রিপোর্টকে ধামাচাপা দেওয়া হতে পারেনা! সন্দেহ থেকেই যায় যে রিপোর্টে দেশের অর্থনীতির যে ছবি বেরোচ্ছে তা মনোমত না হবার জন্যেই এই সিদ্ধান্ত – না হলে, এনএএস-এরও তো হাজার সমস্যা, তার ভিত্তিতে জাতীয় আয়ের ৫% বৃদ্ধির হারের কথা বলা হচ্ছে কেন?



দ্বিতীয়ত, এই দুই পরিসংখ্যান শ্রেণীর মধ্যে সাযুজ্যের অভাব থাকার একাধিক সম্ভাব্য কারণ আছে। তার একটা বড় কারণ হল দেশের অর্থনীতিতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপস্থিতি এবং পরিসঙ্খ্যানে সেটার কিভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার আওতার বাইরে এই যে ক্ষেত্র (যার মধ্যে কৃষিও পড়ে), সেখানে জাতীয় আয়ের প্রায় অর্ধেক উৎপাদিত হয়, আর শ্রমবাহিনীর প্রায় ৮৫% সেখানে নিয়োজিত। অথচ জাতীয় আয়ে এই ক্ষেত্রের অবদান পুরোটাই সংগঠিত ক্ষেত্রের পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করে হিসেব করা হয়। এনএসএস যেহেতু সারা দেশের ওপর ভিত্তি করে পরিবারভিত্তিক সমীক্ষা, তাতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপস্থিতি অনেক বেশি ধরা পড়ে। তাই, উপযুক্ত নীতির আলোচনায় অসংগঠিত ক্ষেত্রকে ভুলে গেলে চলবেনা।  

তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়প্রসার অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর প্রভাবের কথা ভেবে করা প্রয়োজন। তার কারণ দেশবাসীর একটা বড় অংশ এখানেই নিয়োজিত, তাই সার্বিক জনকল্যাণের দিক থেকে তা কাম্য শুধু তার জন্যে নয়। যেহেতু অসংগঠিত ক্ষেত্রে দরিদ্রতর মানুষেরা বেশি সংখ্যায় আছেন, বর্ধিত আয় থেকে তাঁদের খরচ করার প্রবণতা আরও বিত্তশালী শ্রেণীর মানুষের থেকে বেশি, কারণ আয়ের সাথে আনুপাতিক হারে সঞ্চয় করার প্রবণতাও বাড়ে। আর তাঁদের ব্যয়বৃদ্ধি হলে, গণভোগ্য সামগ্রীর চাহিদা বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে সংগঠিত ক্ষেত্রের ওপরেও। তার থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বৃদ্ধির হার, যা বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে, তাও বাড়বে, এবং অর্থনীতি কেইন্সীয় বিষচক্র থেকে মুক্ত হবে।

অনেকে বলছেন আয়করে ছাড় দেবার কথা। কিন্তু এই করের থেকে মোট রাজস্ব জাতীয় আয়ের ২.৫ শতাংশের বেশি নয়, আর এর আওতায় পড়েন জনসংখ্যার বড়জোর ৩ শতাংশ। আর করদাতাদের আয় অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি, তাই এর থেকে ব্যয় কতটা বাড়বে আর সঞ্চয় (বা, ঋণশোধ ) কতটা বাড়বে, তা পরিষ্কার নয়। একই কথা প্রযোজ্য কোম্পানি করের ক্ষেত্রেও।  

হ্যাঁ, অর্থনৈতিক সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন যাতে উৎপাদনক্ষমতার প্রসার ও মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু অর্থনীতির গাড়ি যখন গাড্ডায় পড়ে, তখন স্বল্পমেয়াদি সরকারি নীতির প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিৎ তাকে ঠেলে আবার রাস্তায় তোলা। যে রাস্তায় গাড়ি চলবে তার মেরামত ও উন্নতির কাজ তো তার পরে! এখন কিছু সরকারি প্রকল্পে ব্যয়বৃদ্ধিতে দুটি উদ্দেশ্যই সাধিত হতে পারে, যেমন পরিকাঠামোর ওপর ব্যয়। কিন্তু তা ছাড়াও যে যে প্রকল্পে অসংগঠিত ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের প্রত্যক্ষভাবে আয়বৃদ্ধি হয়, তার দিকে মনোনিবেশ করা দরকার, যেমন মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুরক্ষা প্রকল্প (এমজিএনআরইজিএস)। হ্যাঁ, ব্যয়প্রসারের সুযোগ অপরিমিত নয়, মূল্যস্ফীতির আশংকা সদাবিরাজমান, তাই কতটা ব্যয়বৃদ্ধি করা যাবে আর কতটা বর্তমান বরাদ্দের মান ধরে রাখতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত অর্থমন্ত্রককে বিবেচনার সাথে নিতে হবে।

কিন্তু সময় এসেছে অর্থনীতির গাড়িকে ঠেলে আবার চালু করা, আর তার জন্যে প্রয়োজন অনেকের সম্মিলিত ধাক্কা।

(আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাটির সামান্য দীর্ঘতর সংস্করণ