Monday, March 26, 2018

আমরা সবাই শাক্ত

সোশাল মিডিয়ায় বিশিষ্ট কত মানুষের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর ঝাপসা মিছিলে হঠাৎ এক-একটা মুখ কিরকম ছুঁচের মত বেঁধে চেতনায়, স্মৃতির বিষাদবৃক্ষ থেকে চুইঁয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা ঘন আঠার মত রক্ত । কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস ছিল ২৩ এ মার্চ । আমার মনে ছিলনা । স্ক্রোল ই-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে একটা ইংরেজি লেখা পড়ে খেয়াল হল ।

আশির দশকের কলকাতায় বড় হবার স্মৃতির সাথে মিশে আছে এই উন্মাদ প্রতিভাধরের শব্দমদিরার নেশা । 

তাঁকে ছোটবেলায় কয়েকবার দেখেছি । আমার ঠাকুরদা মণীশ ঘটক যখন বহরমপুর থেকে কলকাতায় আসতেন, দেখা করে যেতেন । কল্লোল যুগ আর কৃত্তিবাস যুগের নানা উদ্দাম উপকথার আদানপ্রদান হত, কিন্তু তখনো আমার কাছে বই মানে হেমেন রায়, ফেলুদা, টেনিদা, বা টিনটিন আর কবিতা মানে স্কুলে রবীন্দ্রকাব্য বা কখনো নজরুল-সুকান্ত আবৃত্তি, তাই এই আলাপচারিতার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করিনি ।

তারপর তন্ময় কৈশোরে বেজে উঠলো রাতের কড়ানাড়া, ভর করলো জীবনানন্দ দাশ আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় । আর (বয়সের আনুমানিক ক্রমানুসারে) প্রেমেন মিত্র, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন চক্রবর্তী,  শঙ্খ ঘোষ ।  আরো পরে এলো পাঠ্য হিসেবে নয়, ভালোবেসে পড়া রবীন্দ্রনাথ । প্রবাসী জীবনে নাস্তিকের ঠাকুরঘর হয়ে উঠলো বাংলা বই এর তাক । তাতে এঁদের সাথে যুক্ত হলেন বীরেন চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অরুণ সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, উৎপলকুমার বসু, নবনীতা দেবসেন, তুষার রায়, জয় গোস্বামী, ভাস্কর চক্রবর্তী .... আরো অনেকে, যার মধ্যে অবশ্যই আমার ঠাকুর্দা মণীশ ঘটক ও পিসতুতো দাদা নবারুণ ভট্টাচার্য্য-ও আছেন। খুঁজে চলেছি কৈশোরে মুগ্ধ করা অনন্য রায়ের বই ।

 

এখন কিছুদিন চলবে শক্তি-আচ্ছন্নতা ।




My translation of Shakti Chattopadhyay's iconic poem ‘অবনী বাড়ি আছো?’

Abani, are you home?

Doors clasped shut, in the still of the night
Someone keeps knocking at the door
‘Abani, are you home?’
It rains here all year long
Clouds graze like cows
Sullen green tube-weeds 
Clasp at the doorway - 
‘Abani, are you home?’
The molten heart aches  
With a distant fading pain
As I doze off  
Suddenly, a knock at the door
‘Abani, are you home?’

Here is the original poem:

অবনী বাড়ি আছো?

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
অবনী বাড়ি আছো?

Sunday, July 16, 2017

যদৃচ্ছ কবিতারাশি ১
বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে
শুয়ে এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে
ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা।
এখন আমার কোনও কষ্ট নেই, কেননা আমি
জেনে গিয়েছি দেহ মানে কিছু অনিবার্য পরম্পরা
দেহ কখনও প্রদীপ সলতে ঠাকুর ঘর
তবু তোমরা বিশ্বাস করোনি
বার বার বুক চিরে দেখিয়েছি প্রেম, বার বার
পেশী অ্যানাটমি শিরাতন্তু দেখাতে মশায়
আমি গেঞ্জি খোলার মত খুলেছি চামড়া
নিজেই শরীর থেকে টেনে
তারপর হার মনে বিদায় বন্ধুগণ,
গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার
রুমাল নাড়ছি
নিভে গেলে ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন
পাপ ছিল কিনা।
তুষার রায়
"দেখে নেবেন ", ব্যান্ডমাস্টার
বিপথগামিতা    

(আজকের আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত)  

গরু, গুজরাত, হিন্দু ও হিন্দুত্ব— এই চারটি শব্দ অমর্ত্য সেনের মুখে থাকার জন্য সুমন ঘোষের তথ্যচিত্র দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’কে ছাড়পত্র দিল না ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। অনীক দত্তের আসন্ন মুক্তিপ্রার্থী কাহিনিচিত্র মেঘনাদবধ রহস্য-র কিছু সংলাপে ব্যবহৃত শব্দ নিয়েও আপত্তি উঠেছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, সেগুলো ‘বিপ’ না করলে ছাড়পত্র পাবে না সেই ছবিও। কী সেই শব্দ? তার একটি উদাহরণ হল, সিনেমার একটি চরিত্র বলছে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যে রামকে সর্বগুণোজ্জ্বল এবং রাক্ষসদের সর্বদোষকলঙ্কিত— এ রকম সাদা-কালো ভাবে দেখানো হয়নি, এ কথা না বলতে। নয়তো কে জানে, এ রামরাজ্যে সেই বইও নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আপত্তি ‘রাম’ এবং ‘নিষিদ্ধ (ব্যান)’ শব্দ দুটি নিয়ে। এখন, দার্শনিক ভাবে দেখলেও নিষিদ্ধ শব্দ নিষিদ্ধ করার মধ্যে একটা স্ববিরোধী ব্যাপার আছে— কাউকে চেঁচিয়ে না চেঁচাতে বলার মতো। কিন্তু বিপ নিয়ে বিপদ আরও অনেক বেশি।
যাযাবর বলেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাঁকে অনুসরণ করে বলা যেতে পারে, বিজেপি সরকার আমাদের দিয়েছে ‘বিপ’, আর কেড়ে নিয়েছে ‘বিফ’। গোমাংস নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ সাধারণ শব্দ ‘আপত্তিকর’ বলে তাকে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপধ্বনিতে। লিখিত অক্ষরের ওপর যেমন কালো কালি লাগানো হয়, শব্দকে দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপের শাসানিতে, শিবরামের ভাষায় বলা যেতে পারে, তার ‘বিপান্ত’ করা হচ্ছে। নিন্দুকে যতই বলে বাংলার ভাঁড়ারে কিছুই নেই, শূন্য, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, বাঙালির আছে দুই মোক্ষম ব-এ শূন্য র: রসবোধ আর রসনা। আরএসএস-এর মনোনীত সংকীর্ণ খাদ্যাভ্যাস এবং সংকীর্ণতর সমাজচেতনা হিন্দু রক্ষণশীল সমাজের বাইরেও সবার ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতার ফোয়ারা ছুটছে।  যেমন, গরু বলা যাবে না, গোস্ত খাওয়া যাবে না, রাম বলা যাবে না, রাম খাওয়া যাবে না, তা হলে আর ‘অচ্ছে দিন’ তো দূরের কথা, বাজারে গিয়ে বিরস বদনে ‘উচ্ছে দিন’ বলতে হবে। 
সেন্সর বোর্ডের এই সব উদ্ভট ক্রিয়াকাণ্ড আমাদের সুকুমার-পরশুরাম-শিবরাম সমৃদ্ধ রসবোধে প্রভূত হাসির খোরাক জোগাতে পারে, কিন্তু যে শব্দগুলো নিয়ে আপত্তি উঠেছে, তার রাজনৈতিক যুক্তি বোঝা শক্ত নয় মোটেই। মোদী সরকার, বিজেপি দল এবং হিন্দুত্ববাদ নিয়ে কোনও সমালোচনা সহ্য করা হবে না, তা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সেনের রাজনৈতিক মতামতই হোক, বা প্রখ্যাত পরিচালক অনীক দত্তের চিত্রনাট্যের সুপরিচিত শ্লেষাত্মক সংলাপ। 
এখন, তথ্যচিত্রে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ নিয়ে সেন্সর বোর্ডের হস্তক্ষেপ মত প্রকাশের স্বাধীনতায় প্রত্যক্ষ আঘাত। আর, অধ্যাপক সেনের মতকে মোটেই বিতর্কিত বলা যায় না, কারণ বিজেপি ২০১৪ সালে ৩১% ভোট পেয়েছিল এবং যাঁরা বিজেপির সমর্থক নন, তাঁদের একটা বড় অংশের মতামত এর থেকে খুব আলাদা নয়। কিন্তু, কাহিনিচিত্রে এক চরিত্রের মুখে সরকারের হালকা সমালোচনার ওপর বিপাঘাত সূক্ষ্ম হলেও, এক দিক থেকে দেখলে আরও মারাত্মক এক অশনি সংকেত। এই যুক্তিতে অমর চিত্রকথা ঘরানার সাহিত্য বাদ দিলে, মহাভারত থেকে মহেশ, যে কোনও কাহিনি নিয়ে বানানো ছবির যে কোনও সংলাপে বিপক্ষেপ করা যায়। গোমাংস ভক্ষণ, ব্যভিচার, বহুবিবাহ, জাতিভেদ প্রথা (একলব্য এবং জতুগৃহ দহন), বীভৎস রস (কীচক বধ), দেবতাদের নিয়ে কেচ্ছাকাহিনি (যথা, দেবরাজ ইন্দ্রের সিলেবাস-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের আখ্যান)— কী নেই মহাভারতে? আর সেন্সর বোর্ডের যে লিখিত আইন, তাতে জাতীয় স্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয়, এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর কারও অনুভূতিতে আঘাত না লাগে বা তাদের মধ্যে কোনও রকম অশান্তি না হয়— এই ধরনের ধোঁয়াটে কথা আছে, যার নানা ব্যাখ্যা হয়, এবং সংকীর্ণ ব্যাখ্যায় প্রায় যে কোনও সিনেমার কোনও না কোনও সংলাপে বিপযোগ্য শব্দ বার করা যেতে পারে।
আসলে সংবাদমাধ্যম বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে  মতপ্রকাশের ওপর যে কোনও রকমের সরকারি নিয়ন্ত্রণেই একটা অভিভাবকসুলভ ব্যাপার আছে। রাষ্ট্র যেন ঠিক করে দেবে নাগরিকেরা পরস্পরের সঙ্গে কী ভাবে ভাবের আদানপ্রদান করবে। এতে দুটো মূল সমস্যা: অকার্যকরতা এবং অবাঞ্ছনীয়তা।
তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের এই যুগে, সেন্সর বোর্ড মনোনীত না করলেও যে কোনও ছবি ইন্টারনেটে তুলে দেওয়া যায়। জনসমুদ্রের অগণন তরঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করবে কোন মজন্তালি সরকার? যে সময়ে, প্রযুক্তির যে পর্যায়ে সরকার কে কী দেখতে পারবে তা নিয়ে একচেটিয়া কর্তৃত্ব ফলাতে পারত, সে যুগ দীর্ঘ কাল অতিবাহিত। এমনকী চিন সরকারও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছে। তাই সেন্সর বোর্ডের অত্যধিক তৎপরতা অসফল হতে বাধ্য। শুধু তা-ই না, যদি দেশের সম্মানরক্ষা মূল উদ্দেশ্য হয়, তা হলে সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে আমাদের সেন্সর বোর্ডের  শিবঠাকুরের আপন দেশে আইন-কানুন সর্বনেশে ধরনের কীর্তিকলাপ প্রচার পেলে, সেই উদ্দেশ্য সাধিত হয় কি?
আর বাঞ্ছনীয়তার কথা ভাবলে, গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের হাতে কে কী দেখবে বা শুনবে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকার যৌক্তিকতা কী? সংস্কৃতির জগতে সেন্সর বোর্ডের মতো অভিভাবকের দরকার কী? আমরা নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে যে ভাবে কথা বলি, যে রকম পোশাক পরি, বাইরের জগতে নিশ্চয়ই তা করি না, কিন্তু সেটা আমরা নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী করি। সামাজিক প্রথার যে সীমারেখা, তা অতিক্রম করলে তার ফল আমাদের ভোগ করতে হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, কাউকে অপ্রিয় কথা বললে বা তার অনুভূতিতে আঘাত দিলে তার কাছ থেকে যেমন ভবিষ্যতে প্রীতি বা সহযোগিতা আশা করা যায় না, সেই রকম বিতর্কিত সিনেমা বানালে সেই পরিচালকের ভাবমূর্তি এবং ভবিষ্যতে ছবির দর্শক সংখ্যা প্রভাবিত হবে। এই বোধ ও বিবেচনা আমাদের নিজেদেরই থাকা উচিত, রাষ্ট্রের সামাজিক আদানপ্রদানে বা কথোপকথনে বা সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মে নাক গলানো উচিত না। আর, কোনও সিনেমা আমাদের আপত্তিকর মনে হলে, আমাদের হাতে আছে চরম এক অস্ত্র— সেটা না দেখা। ঠিকই, কোন ছবিতে কী আছে, সেটা দেখার আগে জানতে গেলে কিছু তথ্য দরকার। তার জন্য কোন ছবি কোন শ্রেণির দর্শকবৃন্দের জন্যে উপযুক্ত, সে রকম একটা শ্রেণিবিভাগের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু তার বেশি সরকারি হস্তক্ষেপের দরকার আছে কি? একটা সিনেমা নিয়ে জানার জন্য লোকের মুখের কথা, সমালোচকদের বক্তব্য, এ রকম আরও তো অনেক সূত্র আছে। 
রসিকতা, হতাশার সঙ্গে মোকাবিলা করার মোক্ষম টোটকা। আর, বাঙালির রসবোধ সিঞ্চিত হয়েছে হতাশা ও বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাসের স্রোতে। তাই আপাতত আমরা সেন্সর বোর্ডের তুঘলকি কাজকম্মে খানিক হাসিঠাট্টা করতেই পারি। কিন্তু সেন্সরের এই ‘বিপ’থগামিতা আমাদের গণতন্ত্রের আকাশে যে বিপজ্জনক সিঁদুরে মেঘের পূর্বাভাস আনে, তার সম্পর্কে অবহিত হওয়া অতি আবশ্যক। রাষ্ট্রের হাতে হুকুম, নিয়ন্ত্রণ, বাধানিষেধ, দমনপীড়নের জাল যত শক্ত হবে, ততই সংকীর্ণ হবে গণতন্ত্রের বৃহত্তর পরিসর, যা নির্বাচনী ক্রিয়াকর্মের বাইরে বিরাজমান। আর যত হাসি তত কান্না, বলেই তো গেছেন রাম, থুড়ি, বিপ শর্মা।

Thursday, October 8, 2015

সব অসাম্য নয় সমান


হার্দিক পটেলের নেতৃত্বে গুজরাতে পটেল সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ নিয়ে আন্দোলন তাঁদের এককালীন হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর বেশ হৃদয়পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে ভারতের রাজনীতিতে সংরক্ষণ একটি পুরনো ভূত, যা মাঝে মাঝেই ঢেলা মারতে শুরু করে।
ভারতের সংবিধানে গোড়া থেকেই তফসিলি জাতি এবং জনজাতিদের জন্যে সরকারি চাকরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৫ শতাংশ এবং ৭.৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত। পরবর্তী কালে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট যখন গৃহীত হয়সামাজিক ও শিক্ষাগত ভাবে পশ্চাৎপদ শ্রেণী, যাকে অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণী (ওবিসি) বলা হয়, তাঁদের জন্যে এর ওপরে ২৭ শতাংশ আসন সংরক্ষিত করা হয়।  
তফশিলী জাতি এবং জনজাতিদের জন্যে সংরক্ষণ জনসংখ্যার মোটামুটি আনুপাতিক  ওবিসি-দের উপস্থিতি বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে কতটা সেটা নিয়ে খানিক বিতর্ক আছে মন্ডল কমিশনে ধরা হয়েছিল তা ৫২%, কিন্তু তার ভিত্তি  ছিল ১৯৩১ সালের আদমসুমারি এই অনুপাত আন্দাজ ৪১%  মত ধরা হয় যে হিসেবই নিই, তাঁদের সংরক্ষরণের মাত্রা আনুপাতিক হারে খানিকটা কম, কারণ তাঁদের মধ্যে যত জাতি তারা সবাই শিক্ষাগত ও সামাজিকভাবে অনগ্রসর নয় তাই তাঁদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুযোগ নিঃশর্ত নয় - তাঁদের পরিবার আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হলে সংরক্ষরণের সুযোগ পাওয়া যাবেনা    অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণীর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (মুসলিম, খ্রিষ্টান, এবং শিখ ) কিছু জাতিও অন্তর্ভুক্ত)
তফসিলি জাতি, জনজাতি এবং ওবিসি-রা একত্র ভাবে অনগ্রসর শ্রেণি, সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এঁদের জন্য ৪৯.৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত। লোকসভার আসনও তফসিলি জাতি এবং জনজাতিদের জন্য (ওবিসি-দের জন্য নয়) তুলনীয় অনুপাতে সংরক্ষিত।
প্রথমেই একটা ভুল ধারণা দূর করা উচিত। সামাজিক বা অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা যাই তার মাপকাঠি হোক না কেন,  সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা দারিদ্র বা বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয় এই সমস্যাগুলোর যে মাত্রা, তাতে চাইলেও সংরক্ষণ নীতি দিয়ে তাতে দাঁত ফোটানো মুশকিল। প্রতি বছর গড়ে যত সরকারি চাকরির পদ খালি হয়, তা দেশের সমস্ত নথিভুক্ত শিক্ষিত বেকারের মাত্র এক শতাংশের মতো। শুধু তা-ই নয়, উচ্চশিক্ষার জন্যে উপযুক্ত বয়সের যে জনসংখ্যা (প্রায় চোদ্দো কোটি), তাদের মাত্র ২০% সরকারি বা বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ছাত্র হিসেবে নথিভুক্ত। তাই সংরক্ষণ নীতি দিয়ে অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষার প্রসারে খুব একটা প্রভাব ফেলা মুশকিল।
সংরক্ষণ নীতির প্রবর্তকরা এই সব বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাঁদের কাছে সংরক্ষণ ছিল সরকারি ক্ষমতার অলিন্দে প্রান্তিক গোষ্ঠীদের উপস্থিতি জোরদার করার একটি আবশ্যক পদক্ষেপ। এর ফলে শাসনযন্ত্র অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের প্রয়োজনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হবে এবং সেই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে আস্থা জন্মাবে যে, এই দেশের শাসনব্যবস্থায় তাঁরাও অন্তত কিছু মাত্রায় অংশীদার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংরক্ষণ ছাড়া সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অনগ্রসর শ্রেণি থেকে যোগ্য প্রার্থী যথেষ্ট সংখ্যায় পাওয়া যাবে না, তাই সংরক্ষণ নীতি শুধু সরকারি চাকরি নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও চালু থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ভারতে সংরক্ষণ নীতির মূল উদ্দেশ্যটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক। এর ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়লে, সামাজিক বৈষম্যের প্রকোপ কমলে, এবং অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষিত এলিট একটি গোষ্ঠী বাকিদের আত্মোন্নতির জন্যে অনুপ্রেরণা জোগালে পরোক্ষ ভাবে তাতে অনগ্রসর শ্রেণীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতে পারে, এটাই ছিল লক্ষ্য। প্রত্যক্ষ ভাবে অনগ্রসর শ্রেণির অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পাদন কিন্তু সংরক্ষণের ঘোষিত উদ্দেশ্য নয়।
শুধু তা-ই নয় । সংরক্ষণ নীতির প্রবর্তকরা এ বিষয়েও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন যে এই নীতি থেকে সর্বাধিক উপকৃত হবেন অনগ্রসর শ্রেণীর সচ্ছলতম অংশগুলি । মণ্ডল কমিশন রিপোর্টে যেমন পরিষ্কার বলা আছে, সংরক্ষণ নীতির ফলে অনগ্রসর শ্রেণী মধ্যে সমতা বাড়বে না, সমাজের আর বাকি সব অংশে যেমন হয়, এই অংশেও অর্থনৈতিক সুযোগ প্রায় সব সময়েই সচ্ছলতর মানুষেরাই কুক্ষিগত করবেন।
সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করার পিছনে মূল কারণ অবশ্যই আমাদের জাতপাত ব্যবস্থার অন্যায় বৈষম্যের বিষময় ইতিহাস, যার ছায়া আমাদের সমাজে এখনও ভয়ানক ভাবে বিরাজমান। মেধার যুক্তিতে যাঁরা সংরক্ষণ-বিরোধী, তাঁরা মহাভারতে একলব্যের গল্পটি মনে করতে পারেন।  সামাজিক বৈষম্যের পৃথিবীতে মেধাতন্ত্র হয় না। কারণ সুযোগের সমানাধিকার মেধাতন্ত্রের একটি অতি আবশ্যক শর্ত। আমেরিকায় ১৯৬০ সালে ৯৫ শতাংশের উপর ডাক্তার এবং আইনজীবী শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ছিলেন। ২০০৮ সালে এই সব পেশায় শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের অনুপাত কমে হয়েছে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, কারণ শ্বেতাঙ্গ নারীরা এবং কৃষ্ণাঙ্গরা এখন এই সব পেশায় ঢুকতে পেরেছেন। এখন, ‘শুধু মেধার কারণে আগেকার জমানায় শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, নারী বা কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের কোনও ভূমিকা ছিল না’, এমন কথা বোধহয় অতি-দক্ষিণপন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলবেন না। ভারতেও ষাটের দশকের গোড়া অবধি প্রশাসনের উচ্চপদে সংরক্ষণ নীতি সত্তেও তফসিলি জাতি থেকে ১ শতাংশের বেশি অফিসার ছিল না। সমস্ত রকম সমীক্ষায় আজও দেখা যায়, উচ্চবর্ণের তুলনায় অনগ্রসর শ্রেণি শিক্ষা, চাকরি এবং আয়, প্রতিটি দিক থেকেই অনেকটা পিছিয়ে।
কিন্তু কথা হল, শুধু সামাজিক বৈষম্যই তো নয়, অসাম্য অনেক রকমের হয়ে থাকে। কেউ বলতেই পারেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য বা লিঙ্গ-বৈষম্য জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের থেকে বৃহত্তর সমস্যা। কিংবা, এমনও ভাবা যেতে পারে যে, সামাজিক ভাবে অনগ্রসর শ্রেণীরা যে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে আছেন, তার জন্য অর্থনৈতিক অসাম্যের ভূমিকা সামাজিক বৈষম্যের থেকে বেশি। আর সেই জন্যই, হার্দিক পটেলের মতো অনেকেই মনে করেন, সংরক্ষণ নীতি জাতভিত্তিক না হয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা-ভিত্তিক হওয়া উচিত। মুশকিল হল, এই অবস্থান জাতভিত্তিক বৈষম্যজনিত অসাম্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, যা বাস্তবসম্মত নয়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দুই প্রজন্মের মধ্যে যদি আর্থিক, পেশাগত এবং শিক্ষাগত তুলনা করা হয় (যেমন, বাবা স্বল্পশিক্ষিত হলেও পুত্র উচ্চশিক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা কত), তা হলে খুব সাম্প্রতিক কাল বাদ দিলে, ঐতিহাসিক ভাবে অগ্রসর জাতিদের মধ্যে অনগ্রসর জাতিদের তুলনায় সচলতা অনেক বেশি। অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সব শ্রেণীর মধ্যেই অর্থনৈতিক সচলতা বাড়ে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরও উন্নতি করার সুযোগ এবং সম্ভাবনা আগের থেকে বেশি হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থানই যদি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা হলে এই সচলতার হার সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করার কথা নয়। তাই তথ্য-পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু অর্থনৈতিক অবস্থান নয়, অর্থনৈতিক সচলতার পিছনে সামাজিক বৈষম্যের ভূমিকা অগ্রাহ্য করা যায় না। সেই কারণে অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে সংরক্ষণ নীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য ।
এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই আবার সংরক্ষণ নীতির কিছু মৌলিক সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। জাতপাত নিয়ে বৈষম্য দূর করতে গিয়ে এমন এক নীতি যদি সমাজের চিরায়ত অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় যার মূল ভিত্তি হল জাতপাত, তা হলে মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার একটা দ্বন্দ্ব বোধহয় থেকেই যায়। এই নীতির প্রয়োগে প্রায় সব ক্ষেত্রেই যোগ্যতার মান সাধারণ শ্রেণীর থেকে কম করে ধরা হয়, যা এই শ্রেণীর অনগ্রসরভাবমূর্তিটিকে জিইয়ে রাখে। শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য যে বাধা সৃষ্টি করে, তার জন্য কয়েক প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই নীতির মাধ্যমে ক্রীড়ার মাঠ সমতল করার চেষ্টা সমর্থন করা যেতেই পারে। কিন্তু আদি-অনন্তকাল ধরে এই নীতি বহাল থাকা কাম্য নয়। বরং অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে যাঁরা অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাৎপদ, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।  
নীতিগত দিক ছেড়ে যদি ফলাফলের দিকটি  দেখি, তা হলেও কিন্তু মানতে হবে, স্বাধীনতার পর প্রায় সাত দশক ধরে তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের জন্য, এবং দুই দশক ধরে অন্য পশ্চাৎপদ শ্রেণীর জন্য সংরক্ষণ নীতি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের উচ্চপদে ২০১১ সালে তাঁদের সামগ্রিক অনুপাত মাত্র ২৩%, যদিও জনসংখ্যায় তাঁদের অনুপাত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। কেউ ভাবতে পারেন, তার মানে সংরক্ষণের হার আরও বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু শিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রে এই শ্রেণীর থেকে যথাসংখ্যক যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া অনেক সময়েই দুঃসাধ্য, তাই অনেক সংরক্ষিত আসন খালি পড়ে থাকে।
জাতভিত্তিক সামাজিক সচলতা নিয়ে যে সমীক্ষার কথা একটু আগে বলছিলাম, তার থেকে পাওয়া এক চিলতে সুখবর এই যে, গত দুই দশকে অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে অর্থনৈতিক সচলতা আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে, এখন তা প্রায় অগ্রসর শ্রেণী সঙ্গে তুলনীয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরি এবং শিক্ষার সুযোগের বিস্তার এর পিছনে একটা বড় কারণ বলে মনে যেতে পারে। সংরক্ষণের মাধ্যমে অনগ্রসর শ্রেণীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সচলতার সুযোগ বাড়ানো তাই কৌশল হিসেবে পরিপূরক। এদের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই।    
রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা যত কম হবে, যাতায়াতের উপায় যত সীমিত হবে, ভিড় বাস  বা ট্রেনে সংরক্ষিত আসন নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ ততই বাড়বে। ঠিক একই ভাবে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের হার যত দিন মন্দ গতিতে চলবে, এবং অর্থনৈতিক সচলতার পথ যত বন্ধুর হবে, অগ্রসর জাতিদের মধ্যে সংরক্ষণ নিয়ে অসন্তোষ মাঝে মাঝেই বজ্রনির্ঘোষের মত  ফেটে পড়বে।  
খটকা  লাগতে পারে, এই আন্দোলন বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মত অনগ্রসর রাজ্যে না হয়ে গুজরাতের মত সম্পন্ন ও বর্ধিষ্ণু রাজ্যে হচ্ছে কেন? আসলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাচ্ছন্দ্যের সূচকে বাকি সব রাজ্যের থেকে এগিয়ে থাকলেও, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হারে গুজরাত অনেকটা পিছিয়ে প্রচার বাদ দিলে গুজরাত মডেলের মূল ভিত্তি হলো পুঁজি-নিবিড় ক্ষেত্রে বৃহৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রভাব স্বভাবত সীমাবদ্ধ
মোদী সরকারের প্রায় দেড় বছর হতে চলল। এখন অবধি উল্লেখযোগ্য কোনও অর্থনৈতিক সংস্কার রূপায়িত হয়নি, অর্থনীতির পালেও হাওয়া লাগেনি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কিছু মৌলিক ফাটল ক্রমশই দৃশ্যমান হয়ে পড়ছে সে জন্যই। সংরক্ষণ নিয়ে আন্দোলন এরই উপসর্গ।
(আনন্দবাজার পত্রিকা,  অক্টোবর ৭, ২০১৫ এ প্রকাশিত প্রবন্ধের দীর্ঘতর সংস্করণ)