Saturday, August 7, 2021

কথার কথা - ট্রোল কাহিনী

 কথার কথা - ট্রোল কাহিনী 

ডাকবাংলা.com-এ সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রোল নিয়ে লেখা (https://daakbangla.com/2021/07/kathar-katha/) 



[অর্থনীতি ও অনর্থনীতি, অর্থশাস্ত্র ও শব্দের অর্থানুসন্ধান, অর্থকরী ও অনর্থক, অর্থময় ও অর্থহীন সমস্ত বিষয় নিয়ে খামখেয়ালি চিন্তাভাবনা]

আলোচনা হচ্ছিল ট্রোল নিয়ে। এক অর্থে ট্রোল হল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপকথার খানিক মানুষ-খানিক রাক্ষস বা দৈত্য গোছের প্রাণী, যারা বেশ দুষ্ট প্রকৃতির এবং মানুষদের নানারকম ভাবে হেনস্থা ও উপদ্রব করা তাদের কাজ। ট্রোল দৈত্যাকার ও হিংস্র হয় (যেমন হ্যারি পটার-এ), আবার খর্বাকৃতি ও খানিক মিচকে প্রকৃতিরও হয়। গুটিয়া দেও বলে এক খুদে দৈত্য ছিল, শান্তা ও সীতা দেবীর হিন্দুস্থানী উপকথায়, নামটা বেশ মনে ধরেছিল। আমার কল্পনায় ওকে খানিকটা ট্রোলের মতো দেখতে। আর মিল পাই খোক্কসের সাথে (‘ঠাকুমার ঝুলি’-তে ছবি আছে), যা হল রাক্ষসের ছোট সংস্করণ। খোক্কস কি খোকা রাক্ষস? কে জানে! যাই হোক, ট্রোলদের খোক্কস বলাই যায়।  

আন্তর্জালিক দুনিয়ায় এক নতুন প্রজাতির খোক্কসের উদ্ভব হয়েছে। এদের কাজ হল ঝগড়া বাধানো এবং করা। আপনি কোনও লেখা লিখলেন অনলাইন কোনও পত্রিকায় বা ফেসবুকে খানিক মনের-প্রাণের কথা লিখলেন, অমনি এই ট্রোলেরা এসে আপনাকে জ্বালাতন করা শুরু করবে— গায়ে পড়ে ঝগড়া, অহেতুক বিতর্ক উস্কে দেওয়া থেকে শুরু করে নেহাতই গালিগালাজ করাই এদের কাজ। মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধান বলছে ট্রোলের আধুনিক অর্থ হল ‘to antagonize (others) online by deliberately posting inflammatory, irrelevant, or offensive comments or other disruptive content’— অর্থাৎ খানিক নারদ, খানিক খোক্কস, আর খানিক ঝগড়ুটে।

ঘটনা হল আন্তর্জালে এই ঝগড়ুটেদের বা বৈদ্যুতিন গুন্ডাদের খুবই বাড়বাড়ন্ত। রাজনৈতিক দলগুলির এখন আইটি সেল থাকে— যাদের কাজ শুধু প্রচার নয়, বিপক্ষের মতকে বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতপ্রকাশকারীকে সরাসরি আক্রমণ করা। তাদের অনেকের এটাই পেশা (এই নিয়ে স্বাতী চতুর্বেদী-র I Am a Troll: Inside the Secret World of the BJP’s Digital Army, Juggernaut Books, 2016 বইটি অবশ্যপাঠ্য) আবার অনেকে এই কাজটা একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীদের মতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে করেন। 

এক-একটা কথা অদ্ভুত স্মৃতি উস্কে দেয়। ‘পেশাদার ঝগড়ুটে’ কথাটা মনে করিয়ে দিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘মাধব ও তার পারিপার্শ্বিক’ উপন্যাসে বর্ণিত একটি ঘটনার কথা। তাতে এক চরিত্র ছিল, একজন বয়স্ক মহিলা, যিনি পেশাদার ঝগড়ুটে। তিনি এরকম একটা কাজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন কিন্তু একনাগাড়ে গালিগালাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় তাঁর সহকারিণীদের বলছেন যে আমি একটু পান খেয়ে জিরিয়ে নিই, তোরা এবার ধর এবং তারা গালিগালাজে কিছু ভুল করে ফেলায় (যথা, মুখে কুট নয়, কুঠ অর্থাৎ কুষ্ঠ হয়েছে) এবং যথাস্থানে পা-দাপানো ঠিকঠাক না হওয়ায় তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের মতোই দুঃখপ্রকাশ করছেন… কবে শিখবি এসব! এঁর নাম ঝাড়ুনি, যা মহাশ্বেতা দেবীর ‘রুদালী’ গল্পে পেশাদার বিলাপকারীর মতো তাঁর পেশাগত নাম বলেই ধরে নেওয়া যায়। পেশাদার ঝগড়ুটে হিসেবে ‘ঝাড়ুনি’ নামটি বেশ উপযুক্ত। এর পুংলিঙ্গ ‘ঝাড়ুয়া’ বা ‘ঝেড়ো’ রাখা যেতে পারে, কারণ ঝাড়ুদার বললে অন্য পেশার কথা মনে হবে যার সাথে এর কোন মিল নেই, আর জঞ্জাল পরিষ্কার করা একটি অতীব প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর কাজ যে, দুটোর কোনওটাই পেশাদার ঝগড়ুটেদের ক্ষেত্রে খাটে না।

কিন্তু ঝাড়ুনি বা ঝেড়োই বলি বা লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ হিসেবে, খোক্কস— আর তারা পেশাদারই হোক বা স্বেচ্ছাসেবক— এমন কিন্তু নয় যে তারা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, যাদের একবার চিহ্নিত করে দুয়ার এঁটে বাইরে রাখলেই এড়ানো যায় এবং সব সমস্যা মিটে যায়। আমাদেরই চেনা-পরিচিত মহলে তাদের অনেক সময় দেখা যায়। ভূতপ্রেতের মতো খোক্কসরাও যে কোনও সময় যে কারোর ওপর ভর করতে পারে।

আসলে সমাজমাধ্যম যেমন আপাতবাস্তব এই পরিসরে চটজলদি সৌহার্দ্য ও আলাপচারিতার সুযোগ করে দিয়েছে, আবার একই সাথে কিছু প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও বিধিনিষেধের রাশও আলগা করে দিয়েছে। যে-ভাষা সর্বসমক্ষে ব্যবহার করতে পাকা ঝাড়ুনিরাও ইতস্তত করবে, এক যান্ত্রিক প্রাচীরের সুরক্ষাবলয় যেন মেঘের আড়াল থেকে সেই ভাষার অস্ত্রনিক্ষেপ করার অবাধ স্বাধীনতা করে দিয়েছে এই আধুনিক মেঘনাদদের।

প্রশ্ন হল, এটা করে তাদের কী লক্ষ্যসাধন হয়? কাউকে আক্রমণাত্মক ভাবে কথা বললে তার মতপরিবর্তনের কোনওই সম্ভাবনা নেই, বড়জোর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার জন্যে লোকে চুপ করে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, অন্যরা এটা দেখে আগেভাগেই বিতর্কিত কোন বিষয়ে মৌনব্রত অবলম্বন করাই মঙ্গল বলে চুপ করে থাকে।

আসলে মারামারি করার মতো ঝগড়া করারও একমাত্র লক্ষ্য শক্তি প্রদর্শন করে নিজের আধিপত্য জাহির করা, অন্য পক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়া। ঝগড়ায় কোনও রকমে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করাটাই যথেষ্ট। তাই দমে বা গলার জোরে টান না পড়লে কোনও পক্ষই থামতে পারেন না, কারণ থামা মানেই হার-স্বীকার। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরই আরেকটি উপন্যাসে (‘আশ্চর্য ভ্রমণ’) একটি ঝগড়ার অনবদ্য বিবরণ আছে, যেখানে বাসে দুই যুযুধান যাত্রী একনাগাড়ে ঝগড়া করে কথা (এবং সম্ভবত দম) ফুরিয়ে যাওয়ায় পরস্পরের প্রতি ‘অ্যাঁঃ অ্যাঁঃ অ্যাঁঃ’ আর ‘ঙ ঙ ঙ!’ বলে যাচ্ছিল। অথচ যুক্তি বা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে খণ্ডন করতে পারলে, গলা তোলার বা অর্থহীন চেঁচামেচি বা গালমন্দ করার দরকার হয় না। বাংলার সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখে মনে হত, একমত না হলে একটা লেবেল লাগিয়ে দিলেই যুক্তি, বুদ্ধি, তথ্য কোনও কিছু ব্যবহার করার দায় থাকে না। আমি আপনার সাথে একমত নই, অতএব আপনি অতি দুষ্ট। কিন্তু বিজেমূল বা বামরাম বা দালাল এসব কথা না বলে ‘লিঃ লিঃ’ বা ‘হোঃ হোঃ’ বা ‘ছোঃ ছোঃ’ বললে আরও তাড়াতাড়ি নিজের মতটা প্রকাশ করা যায় না? আসলে পেশার দায়ে পরীক্ষার খাতা বা প্রবন্ধ পড়ে মূল্যায়ন করার দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি: সারশূন্য বক্তব্য যত সংক্ষিপ্ত হয়, ততই মঙ্গল।

কিন্তু, ঝগড়া আর তর্ক তো এক নয়। লোকে তর্ক করে কেন?

ঝগড়া যদি মারামারির সাথে তুলনীয় হয়— অর্থাৎ যেনতেন প্রকারেণ প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করাই একমাত্র লক্ষ্য, বিতর্ক সেখানে ক্রীড়ার মতো— জেতা মূল উদ্দেশ্য হলেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, না হলে খেলা ভণ্ডুল। বিতর্কে তাই যুক্তি বা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে খণ্ডন করতে হয়— গলা তোলা, অর্থহীন চেঁচামেচি বা গালমন্দ করা কার্যত পরাজয় স্বীকার করার নামান্তর। তাই এখানে ট্রোল বা খোক্কসরা যে রূপ নেয় তা আরেকটু সভ্যভব্য এবং তাই তাদের চট করে সব সময়ে চেনা যায় না। আর তর্কে জড়িয়ে পড়লে আমাদের মধ্যেও কোনও খোক্কস জেগে উঠতে পারে যার একমাত্র লক্ষ্য হল বিপক্ষকে পর্যুদস্ত করা। খেলায় যেমন স্থূল না হলেও সূক্ষ্ম ধরনের ফাউল আছে এবং নানা রকম অসাধু উপায় আছে, বিতর্কের ক্ষেত্রেও এরকম কিছু কায়দা আছে যা এই ছদ্মবেশী খোক্কসেরা ব্যবহার করে। যেমন ধরুন আপনি কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও কাজের সমালোচনা করলেন। এর বিরোধিতা করতে গেলে ঘটনাটির সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, অথবা কী কারণে এই কাজ করা হয়েছে তার ঠিকমতো বিচার-বিবেচনা করলে কাজটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে যতটা অসমর্থনযোগ্য মনে হচ্ছে ততটা মনে হবে না— এরকম মর্মেও একটা যুক্তি খাড়া করা যেতে পারে। যিনি সমালোচনা করছেন তিনি পুরোপুরি না মানলেও, অন্তত বিপক্ষের মতামতটা কী শুনি, এই ভেবে আলোচনা হতে পারে।

অথচ, সমাজমাধ্যমে নানা বিতর্কে তার থেকে বেশি যা শুনবেন সেই কুতর্কের কতগুলো পরিচিত কায়দা আছে । একটার উদাহরণ দিই, যেটার নাম দেওয়া যায় ‘তার-বেলা-পনা’ (whataboutery)। মানে, মানছি কাজটা ঠিক নয় কিন্তু অন্যরা যখন এটা করে, তার বেলা? যেমন : ‘এই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত? আগের জমানা কি ধোয়া তুলসীপাতা ছিল?’ এই ধরনের যুক্তির দুটো প্রধান সমস্যা। এক, মূল বক্তব্যের ওপর আর তর্কটা সীমাবদ্ধ থাকছে না, সেটা হচ্ছে সমালোচকের পক্ষপাত নিয়ে এবং তাই সমালোচনাটা কার্যত অবৈধ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুই, এর অন্তনির্হিত বক্তব্য হল, কোনও দলই ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তাই এসব আলোচনার অর্থ একমাত্র দল বা মতাদর্শগত পক্ষপাতের জায়গা থেকেই লোকে করে। এটা বেশ পিচ্ছিল একটা যুক্তি, কারণ তাহলে কোনওকিছুর তুলনামূলক ভাল-মন্দ বিচার করারই অর্থ হয় না। সাহিত্যে ‘তার-বেলা-পনা’র বিখ্যাত উদাহরণ হিসেবে মনে করে দেখুন অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই বিখ্যাত ছড়া:

‘তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো।
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?’
(‘খুকু ও খোকা’, ১৯৪৭)

এখানে যুক্তিটা খানিকটা খাটে কারণ দুটি অপরাধ তুলনীয় নয়, সবাই মানবেন যে তেলের শিশি ভাঙাটা তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু কোনও সরকারের আমলে দুর্নীতি বা রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে কথা উঠলেই যদি উত্তর হয়, অন্য জমানাতেও হয়েছে, তাহলে তার মানে দাঁড়ায় যে ‘এসব হয়েই থাকে’, ফলত রাজনৈতিক জমানা নির্বিশেষে এই অবাঞ্ছিত বিষয়গুলি কী করে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, সেই আলোচনা শুরু হবার অবকাশ থাকে না এবং স্থিতাবস্থা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই— এই ধরনের নৈরাশ্যের বোধ ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই হয় না।

যারা রাখঢাক না করে প্রকাশ্যেই ট্রোলিং করে, তাদের কাজই হল বিপক্ষকে গলার জোরে চুপ করিয়ে দেওয়া আর অন্যদের কাছে উদাহরণ খাড়া করা যে এদিক-ওদিক কথা বললে তার কী ফল হতে পারে। কিন্তু যারা প্রচ্ছন্নভাবে (এবং কখনও হয়তো সচেতন না হয়েই) বিতর্কে বিপক্ষের বক্তব্য তার-বেলা-পনা-র মতো কিছু প্রচলিত কায়দায় থামিয়ে দেয়, তারাও কার্যত বিতর্ক ও আলোচনার পরিসরকে সংকীর্ণ করে দেয়। এর অনিবার্য পরিণতি হল আলাপ-আলোচনার বৃহত্তর পরিসর থেকে সরে এসে সহমতসম্পন্ন মানুষে ভরা প্রতিধ্বনি-কক্ষে আটকে থাকা।  

এর বিপদ হল টিকা না নিলে যেমন কিছু অসুখ হতে বাধ্য, সেরকম দলমতনির্বিশেষে খোলাখুলি আলোচনার পরিসর সংকীর্ণ হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেলে ক্ষমতাসীন (সে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই হোক বা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই হোক) পক্ষের ভুলত্রুটি সংশোধনের অবকাশ থাকে না আর তার কুফল হয় দীর্ঘমেয়াদি। যতই হোক, কোনও পক্ষেরই (সে দলই হোক বা মতবাদ) সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে সঠিক হওয়া সম্ভব নয়, আর তাই বিতর্ক ও আলোচনার কোনও বিকল্প নেই। সবাই সব বিষয়ে একদম একমত হলে, কথাবার্তা একদম পানসে হয়ে যায়। শুধু তাই না, তার থেকে কারোর কিছু শেখারও থাকে না, বদ্ধ ডোবার মতো পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন বা  বিবর্তনের কোনও সম্ভাবনা থাকে না।

তাহলে উপায় কী? বিতর্ক যাতে ঝগড়া না হয়ে দাঁড়ায়, এবং প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন খোক্কসদের দাপটে যাতে আলোচনা বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্যে খেলার মাঠে যেমন সেরকম সমাজমাধ্যমেও নিজে থেকেই কিছু রীতিনীতির প্রবর্তন আবশ্যক, ঠিক পাড়ার খেলাতেও যেমন দরকার হয়, যার জন্যে বহিরাগত কোনও রেফারি বা আম্পায়ারের দরকার নেই।

মনে হতে পারে, এটা কি বাস্তবসম্মত? পৃথিবীর সর্বত্র রাস্তাঘাটে, দোকানে, বাজারে, পাড়ায়— সবজায়গাতেই তো এরকম কিছু নিয়মকানুন (যেমন, লাইনে দাঁড়ানো) স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই গড়ে ওঠে, তা হলে নেটদুনিয়ায় হবে না কেন?

আজকের মতো শেষ করি সমাজমাধ্যম এবং তার তর্কবিতর্ক ও ঝগড়ার জমজমাট আসর নিয়ে এই ছোট্ট গুণগানটি দিয়ে (কবিগুরুর প্রতি যথাযথ মার্জনাভিক্ষা-সহ):

কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই
চাই বা নাহি চাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
কর্মব্যস্ত দিবসমাঝারে
কর্মনাশা হে বন্ধু মোর,
তর্কসায়রে তুফান তুলিয়া
আপনে করিলে পর।

ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী

 

 

Sunday, May 16, 2021

মৃণাল সেন-এর ৯৮-তম জন্মদিন উপলক্ষে কুণাল সেনের লেখা

কুণাল-দার সাথে মুখোমুখি আলাপ শিকাগো-তে, আন্দাজ ১৯৯৭ সালে। পাঠভবন স্কুল এবং একাধিক প্রজন্মব্যাপী পারিবারিক চেনাজানার কারণে যোগসূত্র হয়ে ছিল আগে থেকেই। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব হতে কোন সময় লাগেনি। শিকাগো-র হাইড পার্ক পাড়ায় একই ফ্ল্যাটবাড়িতে পড়শী হবার সুবাদে কুণাল-দা/নিশা-দির বাড়িতে অনেক আড্ডার সুখস্মৃতি আছে। কুণাল-দার মত জমিয়ে গল্প বলার ক্ষমতা খুব অল্প লোকের আছে।

কুণাল-দার বাবা, চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনের ৯৮-তম জন্মদিন উপলক্ষে লেখা এই লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো, আবার একটু মন খারাপও হল। সত্যি, আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াসে অবহেলা এত দ্রুত এত ঐশ্বর্য ফিকে হয়ে যেতে দেয়.....
‘কভি দূর কভি পাস’- কভি পাস থে, লেকিন দূর-ই রহে গ্যয়া ।

https://www.anandabazar.com/entertainment/kunal-sen-writes-on-his-father-eminent-director-mrinal-sens-birthday-dgtl/cid/1281406?fbclid=IwAR0BQPc1DLgylIJHh7K-7b_EpHLrJxwhUlOuZIiHGybMk7dMmljAv5G_vgc


Monday, April 26, 2021

শীর্ণ ছায়া - রণজিৎ দাশ

শীর্ণ ছায়া 

রণজিৎ দাশ 

সমস্ত মুক্তির পথে অন্ধ ভিখারির মত

ভালোবাসা ঠায় বসে থাকে।

পথের ওপরে তার ক্ষুদ্র, শীর্ণ ছায়া

নিঃশব্দে ডিঙিয়ে যেতে হয়।

সমস্ত মুক্তির পথে, এটুকুই, মূল পরিশ্রম। 


Shrivelled Shadow

Ranajit Das


On all paths to salvation

Love sits still

like a blind beggar


You have to cross

its small shrivelled shadow

Quietly

to pass through

On all paths to salvation, this is the main struggle.

Friday, January 24, 2020

অসংগঠিত ক্ষেত্র আর কেইন্সীয় সামগ্রিক চাহিদার সমস্যা



কথাটা হচ্ছিল দক্ষিণ কলকাতার একটা পরিচিত ওষুধের দোকানে, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এমনিতে সন্ধ্যেবেলা দোকানটায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এবারে একদম ফাঁকা। দোকানের মালিক বলছিলেন যে বিমুদ্রাকরণের পর থেকে তাঁর দৈনিক বিক্রী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, এবং এই হারে চললে কিছুদিন বাদে কমে তা অর্ধেক দাঁড়াবে। বললেন আশপাশের সব দোকানের একই অবস্থা, এবং এই অবস্থায় টিকে থাকার জন্যে অনেকেই ভাবছেন দোকানের কর্মচারী ছাঁটাই করার কথা। “আমাকেও তাই করতে হবে মনে হচ্ছে”, তিনি বললেন। “কিন্তু ওষুধ ছাড়া লোকের চলছে কি করে?” শুনে তাঁর মন্তব্য "লোকে খেতে পেলে তবে তো ওষুধ কিনবে!” বললেন বিমুদ্রাকরণ আর জিএসটির ধাক্কায় সাধারণ মানুষ আর ছোট ব্যবসায়ীদের অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়, অচ্ছে দিন তো দূরের কথা, দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  




নেহাতই একজনের অভিজ্ঞতা এবং মতামত। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে কেইন্স যে সামগ্রিক চাহিদার তত্ত্ব পেশ করে ধ্রুপদী অর্থনীতির জগতে সাড়া তুলেছিলেন ১৯৩০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী মহামন্দার সময়, তার মূল যুক্তিটা খুব পরিষ্কার ধরা পড়ে। আয় কমলে ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা কমে, ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা কমলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাঁটা পড়ে, তখন সেখানে বিনিয়োগ কমা এবং কর্মীদের ছাঁটাই করার প্রবণতা বাড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষের আয় কমে যার ফলে চাহিদা আরো কমে - এই হলো মন্দার বাজারে কেইন্সীয় বিষচক্র। এর থেকে বেরোবার উপায়? সরকার ব্যয় বৃদ্ধি করলে (বা করের বোঝা কমালে) মানুষের আয় বাড়বে, তার থেকে ভোগ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়বে, আর অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগবে, তার থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু মুশকিল হল, এর ফলে বাজেটের ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির আশংকা বাড়বে। তা ছাড়া সরকারের ঋণের বোঝা এমনিতেই যথেষ্ট বেশি, তাই আরও ঋণ নেবার পথও সীমিত।



ওষুধের দোকানের গপ্পো, কেইন্সীয় তত্ত্ব ছেড়ে যদি তথ্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে ভারতীয় অর্থনীতির বেহাল অবস্থা নিয়ে এই মুহূর্তে খুব একটা দ্বিমত হবার সুযোগ নেই। মূল্যবৃদ্ধি হারের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় আয়ের বাস্তব বৃদ্ধির হার যদি দেখি, সেটা গত আর্থিক বছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯%। মাত্র এক বছর আগে জাতীয় নির্বাচনের আগে এই হারের যে আগাম হিসেব সিএসও (সেন্ট্রাল স্ট্যাটিসটিকাল অফিস) দিয়েছিল, তা ছিল ৭%, এবং তখনো বলা হচ্ছিল, সেটা বিশ্বের সর্বাধিক বৃদ্ধির হারের মধ্যে পড়ে।  বর্তমান হিসেব অনুযায়ী এক দশকেরও বেশি আগে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সময়ের পর এটাই সর্বনিম্ন বৃদ্ধির হার। আর সরকারি রাজস্ব এবং ব্যয় যেহেতু বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতেই হয়, তাই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করে যদি জাতীয় আয়ের আপাত বৃদ্ধির হার দেখি, তা হল ৭.৫%, যা ১৯৭৮-এর পরে নিম্নতম বৃদ্ধির হার। বৃদ্ধির হার নিয়ে বড়াই করা বা বাড়িয়ে বলার সমস্যা হল, কোন না কোন সময় তো সরকারের নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসেবও তো করতে হয়, তখন যদি রাজস্ব বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক না হয়, বাজেটের সব হিসেবও তালগোল পাকিয়ে যাবে। তাই এই মুহূর্তে সরকার যে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তার জন্যে অতি বড়ো সমালোচকও সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য - যতই হোক দেশের অর্থনীতির সমস্যার প্রভাব সবার ওপরে পড়ে। 



কিন্তু সমস্যাটার গুরুত্বটা পুরোপুরি স্বীকার না করলে তো  সমাধান বেরোনো মুশকিল। এই প্রসঙ্গে সরকারী বা সরকারের পরামর্শদাতা অর্থনীতিবিদদের কিছু কিছু উক্তি যা কানে আসছে তা খুব একটা ভরসা যোগাচ্ছেনা। কেউ বলছেন, এ তো বাণিজ্য চক্রের ওঠাপড়া, কেউ বলছেন, সারা পৃথিবী জুড়েই তো বৃদ্ধির হার কমেছে, কেউ আবার বলছেন দেশের বৃদ্ধি তখনই তো হবে যদি রাজ্যগুলোর বৃদ্ধি হয়। ঘটনা হল, এটা ঠিকই যে যাহাই পড়ে তাহাই কোন না কোন সময় আবার ওঠে, কিন্তু টানা ছয় ত্রৈমাসিক পর্ব জুড়ে বৃদ্ধির হার যে ক্রমাগত নিম্নগামী, গত আড়াই দশকে তার সমতুল্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আর সত্যি কি সর্বত্রই বৃদ্ধির হার নিম্নগামী? না, ভারতের বৃদ্ধির হার আর সারা পৃথিবীর বা নিম্ন-আয়ের দেশগুলির গড়  বৃদ্ধির হার তুলনা করলে দেখা যাবে যে ২০১৬ সালের পর থেকে ভারতের বৃদ্ধির হার আপেক্ষিকভাবেও নিম্নগামী। আর রাজ্যগুলোর বৃদ্ধির হার দেশের বৃদ্ধির হারকে যে প্রভাবিত করে একথাটা তো সংজ্ঞা অনুযায়ীই সত্যি - যেমন সত্যি যে সারাদেশের আয় বৃদ্ধির হার শেষ বিচারে প্রতি নাগরিকের আয় বৃদ্ধির হারের ওপর নির্ভর করবে। সরকার তো আর মজন্তালী সরকার নয়, যে শুধু হিসেব রাখবে, খাজনা আদায় করবে, আর ধমকধামক দেবে! এ নেহাতই খারাপ ফলাফলের মুখোমুখি হয়ে দায়িত্ব এড়াবার যুক্তি।



তা হলে করণীয় কি?



প্রথমে সমস্যাটার গভীরতা অনুধাবন করতে হবে। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (National Sample Survey, বা NSS) ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয়ের যে হিসেব পাওয়া যায়, তা অনুযায়ী ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে গড় মাথাপিছু জাতীয় ব্যয় কমেছে প্রায় ৪%। গ্রামাঞ্চলে এই হ্রাসের হার ৮.৮%, আর শহরাঞ্চলে স্বল্প (২%) হারে বৃদ্ধি হয়েছে। অথচ জাতীয় আয়ের যে হিসেব আমরা পাই জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান (National Accounts Statistics, বা NAS) দফতর থেকে, সেখানে গড় ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয়ের বৃদ্ধির হার প্রায় ৬%। তা তো হতেই হবে, কারণ ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয় জাতীয় আয়ের প্রায় ৬০%। তাই যেখানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে (জাতীয় আয়ের ৩০%) বৃদ্ধির হার সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ১% হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে ভোগ্যদ্রব্যের ওপর ব্যয় যথেষ্ট হারে না বাড়লে ৫% হারে জাতীয় আয় আর বাড়বে কি করে?

প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং রিসার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর সি রঙ্গরাজন সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে বলেছেন, এই দুই সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে ব্যবধান গত কয়েক দশক ধরে  এতটাই বেড়ে চলেছে যে সেটা কেন ঠিক মত বোঝার জন্যে উপযুক্ত  বিশেষজ্ঞমণ্ডলী নিয়োগ করার আশু প্রয়োজন। দুই সংস্থার কারোরই পরিসংখ্যানব্যবস্থা সমস্যামুক্ত নয় একথা সর্বজনবিদিত, কিন্তু সরকার শুধু এনএসএস-এর রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেয়নি এর নানা সমস্যা আছে বলে। তা থাকতেই পারে, কিন্তু তার উত্তর তো রিপোর্টকে ধামাচাপা দেওয়া হতে পারেনা! সন্দেহ থেকেই যায় যে রিপোর্টে দেশের অর্থনীতির যে ছবি বেরোচ্ছে তা মনোমত না হবার জন্যেই এই সিদ্ধান্ত – না হলে, এনএএস-এরও তো হাজার সমস্যা, তার ভিত্তিতে জাতীয় আয়ের ৫% বৃদ্ধির হারের কথা বলা হচ্ছে কেন?



দ্বিতীয়ত, এই দুই পরিসংখ্যান শ্রেণীর মধ্যে সাযুজ্যের অভাব থাকার একাধিক সম্ভাব্য কারণ আছে। তার একটা বড় কারণ হল দেশের অর্থনীতিতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপস্থিতি এবং পরিসঙ্খ্যানে সেটার কিভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার আওতার বাইরে এই যে ক্ষেত্র (যার মধ্যে কৃষিও পড়ে), সেখানে জাতীয় আয়ের প্রায় অর্ধেক উৎপাদিত হয়, আর শ্রমবাহিনীর প্রায় ৮৫% সেখানে নিয়োজিত। অথচ জাতীয় আয়ে এই ক্ষেত্রের অবদান পুরোটাই সংগঠিত ক্ষেত্রের পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করে হিসেব করা হয়। এনএসএস যেহেতু সারা দেশের ওপর ভিত্তি করে পরিবারভিত্তিক সমীক্ষা, তাতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপস্থিতি অনেক বেশি ধরা পড়ে। তাই, উপযুক্ত নীতির আলোচনায় অসংগঠিত ক্ষেত্রকে ভুলে গেলে চলবেনা।  

তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়প্রসার অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর প্রভাবের কথা ভেবে করা প্রয়োজন। তার কারণ দেশবাসীর একটা বড় অংশ এখানেই নিয়োজিত, তাই সার্বিক জনকল্যাণের দিক থেকে তা কাম্য শুধু তার জন্যে নয়। যেহেতু অসংগঠিত ক্ষেত্রে দরিদ্রতর মানুষেরা বেশি সংখ্যায় আছেন, বর্ধিত আয় থেকে তাঁদের খরচ করার প্রবণতা আরও বিত্তশালী শ্রেণীর মানুষের থেকে বেশি, কারণ আয়ের সাথে আনুপাতিক হারে সঞ্চয় করার প্রবণতাও বাড়ে। আর তাঁদের ব্যয়বৃদ্ধি হলে, গণভোগ্য সামগ্রীর চাহিদা বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে সংগঠিত ক্ষেত্রের ওপরেও। তার থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বৃদ্ধির হার, যা বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে, তাও বাড়বে, এবং অর্থনীতি কেইন্সীয় বিষচক্র থেকে মুক্ত হবে।

অনেকে বলছেন আয়করে ছাড় দেবার কথা। কিন্তু এই করের থেকে মোট রাজস্ব জাতীয় আয়ের ২.৫ শতাংশের বেশি নয়, আর এর আওতায় পড়েন জনসংখ্যার বড়জোর ৩ শতাংশ। আর করদাতাদের আয় অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি, তাই এর থেকে ব্যয় কতটা বাড়বে আর সঞ্চয় (বা, ঋণশোধ ) কতটা বাড়বে, তা পরিষ্কার নয়। একই কথা প্রযোজ্য কোম্পানি করের ক্ষেত্রেও।  

হ্যাঁ, অর্থনৈতিক সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন যাতে উৎপাদনক্ষমতার প্রসার ও মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু অর্থনীতির গাড়ি যখন গাড্ডায় পড়ে, তখন স্বল্পমেয়াদি সরকারি নীতির প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিৎ তাকে ঠেলে আবার রাস্তায় তোলা। যে রাস্তায় গাড়ি চলবে তার মেরামত ও উন্নতির কাজ তো তার পরে! এখন কিছু সরকারি প্রকল্পে ব্যয়বৃদ্ধিতে দুটি উদ্দেশ্যই সাধিত হতে পারে, যেমন পরিকাঠামোর ওপর ব্যয়। কিন্তু তা ছাড়াও যে যে প্রকল্পে অসংগঠিত ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের প্রত্যক্ষভাবে আয়বৃদ্ধি হয়, তার দিকে মনোনিবেশ করা দরকার, যেমন মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুরক্ষা প্রকল্প (এমজিএনআরইজিএস)। হ্যাঁ, ব্যয়প্রসারের সুযোগ অপরিমিত নয়, মূল্যস্ফীতির আশংকা সদাবিরাজমান, তাই কতটা ব্যয়বৃদ্ধি করা যাবে আর কতটা বর্তমান বরাদ্দের মান ধরে রাখতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত অর্থমন্ত্রককে বিবেচনার সাথে নিতে হবে।

কিন্তু সময় এসেছে অর্থনীতির গাড়িকে ঠেলে আবার চালু করা, আর তার জন্যে প্রয়োজন অনেকের সম্মিলিত ধাক্কা।

(আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাটির সামান্য দীর্ঘতর সংস্করণ 



Saturday, October 26, 2019

দারিদ্রের অর্থনীতি...

আমি নিতান্ত গরীব ছিলাম, খুবই গরীব। আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না, আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না, আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না। অসীম দয়ার শরীর আপনার, আপনি এসে আমাকে বললেন, না, গরীব কথাটা খুব খারাপ, ওতে মানুষের মর্যাদা হানি হয়, তুমি আসলে দরিদ্র। অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমার কষ্টের দিন, আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আর শেষ হয় না, আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম। হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন, দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম, দরিদ্র শব্দটিও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব। দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিন রাত্রি, গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে, শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে, বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে, আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম। আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই, আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন, তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না, তুমি নিঃস্ব হবে কেন, তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে, তুমি বঞ্চিত, তুমি চিরবঞ্চিত। আমার বঞ্চনার অবসান নেই, বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে, উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে, কঙ্কালসার আমার বেঁচে থাকা। কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি, এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত, আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন, জাগো, জাগো সর্বহারা। তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই, ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি, আমার বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে, আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে আমি তাল মেলাতে পারছি না। ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে, আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান, আরো চৌকস হয়েছেন। এবার আপনি একটি ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে এসেছেন, সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন। এবার বড় পরিশ্রম হয়েছে আপনার, কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন, এই যে রেখা দেখছো, এর নিচে, অনেক নিচে তুমি রয়েছো। চমৎকার! আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ! আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আমার সর্বহারাত্বের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আর সবশেষে ওই ঝকঝকে লম্বা রেখাটি, ওই উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু, ক্রমশ, আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে, আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে, আমার মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে। কিন্তু ধন্যবাদ, হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!


তারাপদ রায়, দারিদ্র্যরেখা

Monday, March 26, 2018

আমরা সবাই শাক্ত

সোশাল মিডিয়ায় বিশিষ্ট কত মানুষের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর ঝাপসা মিছিলে হঠাৎ এক-একটা মুখ কিরকম ছুঁচের মত বেঁধে চেতনায়, স্মৃতির বিষাদবৃক্ষ থেকে চুইঁয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা ঘন আঠার মত রক্ত । কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস ছিল ২৩ এ মার্চ । আমার মনে ছিলনা । স্ক্রোল ই-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে একটা ইংরেজি লেখা পড়ে খেয়াল হল ।

আশির দশকের কলকাতায় বড় হবার স্মৃতির সাথে মিশে আছে এই উন্মাদ প্রতিভাধরের শব্দমদিরার নেশা । 

তাঁকে ছোটবেলায় কয়েকবার দেখেছি । আমার ঠাকুরদা মণীশ ঘটক যখন বহরমপুর থেকে কলকাতায় আসতেন, দেখা করে যেতেন । কল্লোল যুগ আর কৃত্তিবাস যুগের নানা উদ্দাম উপকথার আদানপ্রদান হত, কিন্তু তখনো আমার কাছে বই মানে হেমেন রায়, ফেলুদা, টেনিদা, বা টিনটিন আর কবিতা মানে স্কুলে রবীন্দ্রকাব্য বা কখনো নজরুল-সুকান্ত আবৃত্তি, তাই এই আলাপচারিতার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করিনি ।

তারপর তন্ময় কৈশোরে বেজে উঠলো রাতের কড়ানাড়া, ভর করলো জীবনানন্দ দাশ আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় । আর (বয়সের আনুমানিক ক্রমানুসারে) প্রেমেন মিত্র, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন চক্রবর্তী,  শঙ্খ ঘোষ ।  আরো পরে এলো পাঠ্য হিসেবে নয়, ভালোবেসে পড়া রবীন্দ্রনাথ । প্রবাসী জীবনে নাস্তিকের ঠাকুরঘর হয়ে উঠলো বাংলা বই এর তাক । তাতে এঁদের সাথে যুক্ত হলেন বীরেন চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অরুণ সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, উৎপলকুমার বসু, নবনীতা দেবসেন, তুষার রায়, জয় গোস্বামী, ভাস্কর চক্রবর্তী .... আরো অনেকে, যার মধ্যে অবশ্যই আমার ঠাকুর্দা মণীশ ঘটক ও পিসতুতো দাদা নবারুণ ভট্টাচার্য্য-ও আছেন। খুঁজে চলেছি কৈশোরে মুগ্ধ করা অনন্য রায়ের বই ।

 

এখন কিছুদিন চলবে শক্তি-আচ্ছন্নতা ।




My translation of Shakti Chattopadhyay's iconic poem ‘অবনী বাড়ি আছো?’

Abani, are you home?

Doors clasped shut, in the still of the night
Someone keeps knocking at the door
‘Abani, are you home?’
It rains here all year long
Clouds graze like cows
Sullen green tube-weeds 
Clasp at the doorway - 
‘Abani, are you home?’
The molten heart aches  
With a distant fading pain
As I doze off  
Suddenly, a knock at the door
‘Abani, are you home?’

Here is the original poem:

অবনী বাড়ি আছো?

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
অবনী বাড়ি আছো?

Sunday, July 16, 2017

যদৃচ্ছ কবিতারাশি ১
বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে
শুয়ে এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে
ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা।
এখন আমার কোনও কষ্ট নেই, কেননা আমি
জেনে গিয়েছি দেহ মানে কিছু অনিবার্য পরম্পরা
দেহ কখনও প্রদীপ সলতে ঠাকুর ঘর
তবু তোমরা বিশ্বাস করোনি
বার বার বুক চিরে দেখিয়েছি প্রেম, বার বার
পেশী অ্যানাটমি শিরাতন্তু দেখাতে মশায়
আমি গেঞ্জি খোলার মত খুলেছি চামড়া
নিজেই শরীর থেকে টেনে
তারপর হার মনে বিদায় বন্ধুগণ,
গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার
রুমাল নাড়ছি
নিভে গেলে ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন
পাপ ছিল কিনা।
তুষার রায়
"দেখে নেবেন ", ব্যান্ডমাস্টার