Sunday, August 31, 2014

অধরা অসাম্য?

বেয়াড়া কতগুলো প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

ক। আপনি কি মনে করেন যেকোন প্রতিযোগিতায় সব অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ফলাফল সমান হওয়া উচিত, বা ফলাফল আলাদা হলেও, পুরস্কারের অর্থ বা সম্মানমূল্য সমান হওয়া উচিত? “আমরা সবাই জয়ী আমাদের এই জয়ীর জয়োৎসবে” বলে যাতে গান গাইতে গাইতে প্রতিযোগীরা বাড়ি ফিরতে পারবে, সফল প্রতিযোগীর হাতে পুরস্কারের ট্রফি আর ব্যর্থ প্রতিযোগীর শুকনো মুখ আর চোখের কোণে চিকচিকে জলের আভাস আর আমাদের দেখতে হবেনা (এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্মানির কাছে হারার পরে ব্রাজিল সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই মনে আছে)।  কেউ যদি বেশি ভালো খেলে, সেটা দর্শকেরা বেশি উপভোগ করতেই পারেন এবং তার জন্যে সে বেশি প্রশংসা পেতেই পারে, কিন্তু পুরস্কার বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে জেতা এবং হারার মধ্যে বৈষম্য তৈরি করার প্রয়োজন কি? যতই হোক, দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম কয়েকজনের মধ্যে তো সময়ের ফারাক তো এক সেকেন্ডের অতি-ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের বেশি হয়না ।                

খ। আপনি কি মনে করেন প্রখ্যাত কোন লেখকের কিছু লেখা তাঁর কাছ থেকে নিয়ে তুলনায় অনামা লেখকদের মধ্যে বিলি করে তাঁদের নামে ছাপানো উচিত? কিম্বা, নিয়ম করে দেওয়া উচিত তিনি অন্যদের থেকে বেশি লিখতে পারবেননা বা বেশি লিখতে চাইলে তাঁকে আর্থিক বা শ্রমের মাধ্যমে জরিমানা দিতে হবে ? ভাবছেন তো, এটা কিরকম বিদঘুটে প্রস্তাব হল! কিন্তু খ্যাতির জায়গায় যদি আয় ভাবি, আয়-করের ভূমিকা অন্তত কারো কারোর মতে তো একই রকম -  যিনি উদ্যোগ, ক্ষমতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে বেশি অর্জন করতে সক্ষম, তাঁকে বেশি কর দিতে হয়। আরো দুএকটা উদাহরণ আলোচনা করা যাক। অঙ্কে যে ছাত্র খুব ভালো, বার্ষিক পরীক্ষায় তার জন্যে অন্যদের থেকে যদি কম সময় বা অঙ্কে যে কাঁচা তার জন্যে বেশি সময় ধার্য করা হয়? অথবা, সময় একই রেখে পরীক্ষার প্রশ্ন কতটা শক্ত হবে তা যদি ছাত্রদের পারদর্শিতার ওপর ভিত্তি করা হয় বা একই ভুলের জন্যে ভালো ছাত্রর বেশি নম্বর কেটে নেওয়া হয়? স্কুলের ছাত্রদের কথাই যখন হচ্ছে, আরেকটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ধরুন একটি ছাত্রের মা বা বাবা উচ্চশিক্ষিত এবং সন্ধ্যেবেলা তিনি তাঁর ছেলে বা মেয়ের পড়াশুনো নিয়ে অনেকটা সময় দেন। এই ছাত্র তার সহপাঠীদের তুলনায় অনেকটা সুবিধা পাবে। তাহলে কি তুলনায় স্বল্পশিক্ষিত পরিবারের ছাত্রদের বাড়িতে এই ছাত্রটির মা বা বাবাকে বাধ্যতামূলকভাবে পড়াশুনো দেখাতে বাধ্য করা উচিত, বা এই আপাত-সুবিধাসম্পন্ন ছাত্রের পরীক্ষার ফলের মূল্যায়ন আরও শক্ত মাপকাঠিতে করা উচিত? 
         
গ। রূপবান পুরুষ বা রুপসী নারীদের যদি বেশি কর দিতে বাধ্য করা হয়, এবং সেই অর্থ অন্যদের মধ্যে যদি বণ্টন করে দেওয়া হয়, কেমন হয়? যতই হোক সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র বলে তো একটা কথাই আছে। এই প্রসঙ্গে একটা পরিচিত গানের কলি মনে পড়ে যেতে পারে, “আর তোমরা যাকে করছ বিয়ে, আমিও তাকে চাই।”  বিয়ের ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। ধরা যাক বিবাহযোগ্য সমস্ত ছেলে এবং মেয়েকে তাদের কোনও একটি যোগ্যতার ভিত্তিতে (যেমন, কে কত দূর লেখাপড়া জানে বা কে কতটা আকর্ষক) ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে ফেলা হল। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হল বিপরীত লিঙ্গের সবচেয়ে আকর্ষক মানুষটিকে বিয়ে করতে চাওয়া। কিন্তু, চাইলেই তো আর হয়  না, সবচেয়ে আকর্ষক মেয়েটি সবচেয়ে আকর্ষক ছেলেটিকেই বিয়ে করবে। পরিভাষায় একে বলা হয় অ্যাসর্টেটিভ ম্যাচিং বা সমতুল্য সমন্বয়। চন্দ্রবিন্দুর জনপ্রিয় এই গানের আবেগটি তাই আমাদের স্পর্শ করলেও, বাস্তবের খাতিরে বলতেই হয়, “কোন চান্স নেইরে, ভাই”। ঠিক আছে, হয়তো এই উদাহরণটা একটু বেশিই অবাস্তব হয়ে গেল। যতই হোক সৌন্দর্য বা আকর্ষণক্ষমতার কোন নৈর্ব্যক্তিক মান হয়না।  কিন্তু মানুষের শারীরিক, মানসিক, এবং চারিত্রিক অনেক বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাদের জীবনে সুখ-দুঃখ সাফল্য-ব্যর্থতা  নির্ধারণ করায় বড় ভূমিকা পালন করে, অথচ প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে এই উপাদানগুলো সবাই সমানভাবে পায়না। যে সপ্রতিভ বা মিশুকে সে বন্ধুমহলে বেশি জনপ্রিয় হয়।  যার বংশধারার কারণে স্বাস্থ্য ভালো সে বেশিদিন সক্ষম থাকে এবং দীর্ঘায়ু হয়। যার স্বভাব শান্ত বা ধৈর্য বেশি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অধিকতর সুখী হবার সম্ভাবনা। এই ধরণের সব বৈশিষ্ট নিয়ে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য, সেগুলো কমাবার জন্যে কি কোন নীতি অবলম্বন করা উচিত অথবা সম্ভব? এই উদাহরণ গুলো হয়ত একটু “চেরাপুঞ্জির থেকে, একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে” ধরণের চিন্তার মত শোনাচ্ছে, কিন্তু অসাম্য নিয়ে আলোচনায় শুধু আয় বা সম্পদের কথা ভাবলে তা অন্তত যুক্তির দিক থেকে বড় বেশি সঙ্কীর্ণ তা আশা করি তর্কের খাতিরে মেনে নেবেন। 
 
ভাবছেন তো, একটু বেশি ডানপেশে হয়ে গেল কথাগুলো? একটু সবুর করুন...  

পরের কিস্তির লিংক: http://maitreesh.blogspot.com/2014/09/blog-post.html

 


 

 

No comments:

Post a Comment